বঙ্গবন্ধুর অবদানই তাকেঁ চিরঅম্লান করেছে

80
রায়হান আহমেদ তপাদার:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাঙালি জাতির জনকেই পরিণত হননি, বাঙালির বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মুক্তিসংগ্রামের নেতা। তার নেতৃত্বে সংগঠিত বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মুক্তিসংগ্রামের প্রেরণার উৎস। যে মানুষটি সারাটা জীবন কাটিয়েছেন দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্য, একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ দেখবার জন্য।সেই মানুষটিই হচ্ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব-মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলা- দেশের। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিছক একটি ভূখণ্ড লাভ কিংবা পতাকা বদলের জন্য হয়নি। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সার্বিক মুক্তির আশায়। জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন মূর্ত হয়েছিল ৭২-এর সংবিধানে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শুধু সামরিক পরাজয়ই হয়নি, তাদের ধর্মের নামে রাজনীতি, হানাহানি, হত্যা ও ধ্বংসের দর্শনেরও পরাজয় ঘটেছিল। এটি সম্ভব হয়েছিল সকল ধর্মীয় বিভাজনের উর্ধ্বে উঠে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের চেতনায় জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালিত্বের এই চেতনার প্রধান রূপকার, যার ভিত নির্মাণ করেছিল হাজার বছরের বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অসাম্প্রদায়িক, মানবিকতার ঐতিহ্য। বাঙালির এই ঐক্য পাকিস্তান ভেঙেছে, ধর্মের নামে রাজনীতির অমানবিক ধারণা ভেঙেছে। একটা জাতির অস্তিত্ব ও বিকাশের জন্য, অধিকার আদায়ের জন্য শেখ মুজিবের আত্মত্যাগ ইতিহাসে বিরল। স্ত্রী-সন্তানের সান্নিধ্যের মায়া ত্যাগ করে একটা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য যৌবনের একটা বিরাট অংশ তিনি জেলে কাটিয়েছেন। যে জাতির জন্য এ কাজ তিনি করেছিলেন, তার নাম বাঙালি জাতি। বিনিময়ে সেই বাঙালি জাতিই এর প্রতিদান দিল তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারা জীবন ধরে যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, তিনি নিজেই এর ট্র্যাজিক হিরো। কবি টোকন ঠাকুর তাঁর এক কবিতায় লিখেছেন, ‘মহাকাব্যের ট্র্যাজেডির শর্ত পূরণের জন্যই কি তবে তিনি নিজেই নিজের রক্ত ঢেলে দিলেন?’ কারণ একটি জাতি, কিছু মানুষ এত কৃতঘ্ন কীভাবে হয়? এ প্রশ্ন মহাকালের অনন্ত আকাশে ভেসে বেড়াবে প্রলয় অবধি।১৯২০ এর ১৭ই মার্চ, এই মহান নেতার জন্ম হয়েছিল, গোপালগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বিস্তীর্ণ মধুমতি নদী আর সবুজ বনান্তের আড়ালে কেটে গিয়েছে তাঁর দুরন্ত শৈশব আর কৈশোরকাল।বাংলার জল-মাটি-হাওয়ায়, হাজার বছরের ঐতিহ্য সংস্কৃতির আবেগে গড়ে উঠেছে তাঁর মনোজগত। স্বদেশ প্রেমের উপলব্ধিতেই তিনি রূপসী বাংলাকে দেখেছেন। অসীম আকাশের মত মুক্ত হৃদয় নিয়ে ভালোবেসেছেন বাংলার মানুষ, সাগর, নদী, পাহাড়, পশু-পাখি-মাঠ-ঘাট আর অনাবিল প্রকৃতিকে।বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র নেতা যিনি ভাষায়, সংস্কৃতিতে জন্মসূত্রে এবং জাতিসত্তার এক পরিপূর্ণ বাঙালি।আর এই মন্তব্য উচ্চারিত হওয়ার মূলে ছিল বঙ্গবন্ধুর নিখাদ দেশপ্রেম। বাংলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, সাধারণ মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার টানেই মাতৃভূমি এবং জনমানুষের কল্যাণে তিনি আজীবন অকাতরে জীবন, যৌবন, মেধা, মননকে বিলাতে পেরেছেন। পাকিস্তানী শাসকদের নিষ্ঠুর নিপীড়ন, অন্যায়-অত্যাচার উপেক্ষা করেছেন শারীরিকভাবে। তুচ্ছ তৃণের মত ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন মৃত্যুর নিশ্চিত পরোয়ানাকে। হাজার বছরের রূপসী বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ভালোবেসে একদিকে তিনি আবেগের তরল স্রোতে ভেসেছেন। অন্যদিকে যুদ্ধরত সৈনিকের মতই নির্মোহ জবাবদিহিতার দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে স্বদেশবাসীর কল্যাণের জন্য উঠেছেন অকুন্ঠভাবে নির্ভীক। নেতৃত্বের এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্য মুগ্ধ করেছে জাতিকে। বিস্মিত করেছে আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে।

বাংলাদেশের স্থপতি অত্যাচারিত জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে যতখানি প্রশংসিত, ততটাই শ্রদ্ধেয় জাতির পিতা হিসেবে। কারণ বাইরের ধর্মের সংকীর্ণ গন্ডীর বাইরে দাঁড়িয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোয় তিনি নিজে যেমন আলোকিত হয়েছিলেন, তেমনি সবদিক থেকে পিছিয়ে থাকা কয়েক কোটি মানুষকেও পিতার মত নিবিড় স্নেহে এক স্বপ্নের সুতোয় বেঁধেছিলেন। এই অবদানই তাঁকে চিরঅম্লান করে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।
১৯৭৫ থেকে ২০২২। ৪৭ বছর অতিক্রান্ত। আরো অনেক বছর কেটে যাবে। হাজার বছর যাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সব সময় স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। আসলে বঙ্গবন্ধু এমন একজন মানুষ, যাঁকে তাঁর জীবনের প্রতিটি পরতে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। তিনি সেই মানুষ, যাঁর দুই চোখে সব সময় খেলা করেছে বাংলাদেশ। এক সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির চিন্তায় ব্যয় করেছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পা রাখার পর বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতায় তিনি কেবলই দেশ ও দেশের মানুষের কথা বলেছেন। মানুষের কল্যাণে উৎসর্গীকৃত ছিল তাঁর জীবন। মহত্প্রাণ মানুষটি কেবলই মানুষের মঙ্গলের কথা ভেবেছেন।বঙ্গবন্ধু সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। মানুষের মধ্যে নিজের স্বপ্ন বপন করতে পারতেন। সাধারণ্যে মিশে সাধারণের মতোই জীবন যাপন করতে চেয়েছেন তিনি। নিজেকে কোনো ঘেরাটোপে বন্দি করতে চাননি। মানুষের সঙ্গে মিশতে চেয়েছেন। মানুষের দুঃখ ভাগ করে নিতে চেয়েছেন। দেশের শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়েও তাঁর বাড়িটি ছিল সাধারণ একটি বাড়ি। বাড়ির আটপৌরে পরিবেশের সঙ্গে বাংলার সাধারণ পরিবারের অন্দর মহলের সাযুজ্য। এখানেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অন্যদের তফাত। তিনি অসাধারণ হয়েও জীবন যাপনে ছিলেন অতি সাধারণ। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ মন্তব্য করেছিলেন, ‘মুজিব-নেতৃত্বের অভ্যুদয় এশিয়ার রাজনীতিতে এক নবযুগের সূচনা। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মিলে অবিভক্ত ভারতে যে ধর্মান্ধতা ও বিভাজনের রাজনীতি ছড়িয়ে গেছে, বিবাদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে রেখে গেছে, শেখ মুজিবের রাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি সেই বিভাজন, ধর্মান্ধতা ও সংঘাত-বিবাদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের সুফল ভোগ করবে সারা উপমহাদেশ। বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকে অসাম্প্রদায়িকতায় এবং অসাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকে ধর্মনিরপেক্ষ-সমাজ তান্ত্রিক রাজনীতিতে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর মৌলিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। এই মৌলিক আদর্শটি ছিল একটি সমাজতন্ত্রঘেঁষা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাভিত্তিক, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠন। বাংলাদেশে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, তাঁর এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু বাংলাদেশের নয়, এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে যেত।
ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল তাঁর জীবনদর্শনের একটি অন্যতম দিক। ছাত্রজীবন থেকে তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার মানবিক দর্শন নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করে ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘আমার কাছে তখন হিন্দু-মুসলমান বলে কোনো জিনিস ছিল না। হিন্দু ছেলেদের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদন উপলক্ষে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছিলেন দেশের মানুষের জন্য। নির্যাতন-নিপীড়ন মেনে নিয়েছিলেন মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই। 

তাঁর মতো নিঃস্বার্থ রাজনীতিবিদ বিরল। সব মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে বঙ্গবন্ধু আজ সমহিমায় অধিষ্ঠিত। 
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, দানবের মূঢ় অপব্যয়, গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিহাসে শাশ্বত অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু সমহিমায় ইতিহাসের অনন্য পুরুষ হিসেবে তাঁর স্থান করে নিয়েছেন। খলনায়করা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত। পুরো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি সোনালি স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর চোখে। একটি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ভিতটা প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। অনেকের ধারণা, সেই স্বপ্ন সফল হলে আজ বাংলাদেশ হতো সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার চেয়েও উন্নত ও পরিচ্ছন্ন একটি দেশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধু যদি তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অভিযাত্রা অবিচ্ছিন্নভাবে আরো দশক দুই চালিয়ে যেতে পারতেন, তাহলে তাঁর আরাধ্য সোনার বাংলা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতাম আমরা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘপথ পরিক্রমায় অনেক জাতীয় নেতাই অংশগ্রহণ করেছিলেন তবে অনেকের মধ্য থেকে যিনি ধীরে ধীরে সাড়ে সাত কোটি মানুষের একক প্রতিনিধি হয়ে ওঠেছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাকে সাড়ে সাতকোটির আকাক্সক্ষা হিসাবে রূপান্তর করতে সক্ষম হন। এরই ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ৫৪ হাজার বর্গমাইল ভূখন্ডের সকল মানুষের সাধারণ আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নকে কবিতার মতো লিপিবদ্ধ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রে। জীবনের পথ চলতে তিনি কারো কাছে ছিলেন খোকা মিয়া, কারো কাছে মুজিব, কারো কাছে মুজিব ভাই, কারো কাছে শেখ সাহেব। এই শেখ সাহেবই ৬ দফা পেশের পর বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের কুঠোরে অবস্থান গ্রহণ করলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হিসাবে মৃত্যুর দোর গোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে ১৯৬৯ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হলেন আর ১৯৭১ সালে তিনি হলেন জাতির পিতা। 

২০০৪ সালে বিবিসি পরিচালিত বহুল আলোচিত শ্রোতা জরিপে তিনি নির্বাচিত হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসাবে।বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি চরিত্রের সরলতা, জনগণের প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা তাকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তিনি ভাষা আন্দোলনে সূচনা লগ্নে ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনের একটা যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে ভাষা ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এদিক দিয়ে এই অঞ্চলে তো বটেই সমগ্র বিশ্বে তিনি একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি সকল ধর্মীয় সত্তাকে একত্রিত এবং সমন্বিত করে একটি অভিন্ন জাতিসত্তায় রূপান্তর ঘটান।
পরিবর্তিত পৃথিবীর অস্থির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে এগুতে হবে বঙ্গবন্ধুর দর্শন অনুসরন করে।বাংলাদেশ যদি একটি আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, যদি আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায়, যদি যুদ্ধ-জিহাদ-সন্ত্রাস-গণহত্যা বিধ্বস্ত বিশ্বে মানবকল্যাণ ও শান্তির আলোক বর্তিকা জ্বালাতে চায় তাহলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষ শত সহস্র বছরের নানা উপাদান, নানা ক্ষেত্রের প্রতিভাবানের তাৎপর্যপূর্ণ অবদানে ধীরে ধীরে একটি জাতি হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠে, এবং কোনো একটা যুগে সেই জাতি তার সামাজিক সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রসত্তাগত চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে।দেশের সর্বস্তরের বিপুল মানুষের মনে এই সর্বোচ্চ চেতনার স্তর সৃষ্টিতে যে নেতার প্রধান ভূমিকা থাকে এবং সে ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত হয়ে যখন তা একটা যুগ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় তখনই কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর মাহেন্দ্রক্ষণ। বাঙালি জাতির জীবনে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। আর সেই চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেন,'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’বাঙালি জাতি হাজার বছর ধরে এই ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল। 

আর এই জন্যই শেখ মুজিব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কারণ, তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নের এবং অন্তরের অন্তস্থলে গুমরে মরা স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন সেদিন। যুগের দাবিকে, সাহসে শৌর্যে, বীর্যে ভাষা দিয়েছিলেন তিনি, দখলদার বাহিনীর কামান, বন্দুক, হেলিকপ্টার গান শিপের যে- কোনো মুহূর্তে গর্জে ওঠার ভয়াল পরিস্থিতির মুখে। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো নেতা এমন জটিল পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এতো অকুতোভয়ে স্বাধীনতার কথা উচ্চারণের সাহস করেননি। এই নজীর বিহীন ঘটনার জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা এবং নিজস্ব রাষ্ট্রসত্তাগত বাঙালি জাতির পিতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্রষ্টা।এভাবেই বঙ্গবন্ধু বাংলার বাঙালির। তিনি বাঙালি জীবনে হিরন্ময় জ্যোতি। ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চির অম্লান।বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চেতনার মূর্ত প্রতীক। নীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন কোমল হৃদয় ও অসীম সহ্য ক্ষমতার অধিকারী। ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট