নবীজীর প্রেমিক হযরত বিলাল (রাঃ) ও হৃদয় বিদারক দৃশ্যপট

225

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু, লেখক কলামিষ্ট : হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। নবীকুল শিরোমনি ও সর্বশেষ নবী বা পয়গম্বর। দুনিয়াতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত দাউদ (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) সহ আরও অনেক নবী আগমন করলেও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আখেরী জামানার নবী। অর্থাৎ তারপর দুনিয়তে আর কোনো নবী আগমন করবেন না। তিনি আল্লাহ রাব্বুল আল আমীনের হাবিব বা দোস্ত। আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন তাহার মহব্বতেই দুনিয়া ও আরশ সৃষ্টি করেছেন। আমরা (মুসলমান) হলাম হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর গর্বিত উম্মত। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত উছমান (রাঃ) ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের চার খলিফা। ইসলামের প্রচার, প্রসারে তাঁদের ত্যাগ ও অবদান অপরিসীম। খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ওফাতের পর ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানরা কাফেরদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে মহাসংকট ও রোষানলে পতিত হতে যাচ্ছিল।

সেই সময় তোলায়হা, মুসারলামা, সাজাহসহ চার ভন্ড নবীর আবির্ভাব ঘটে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক প্রফেসর ফিলিপ কে হিট্টির (পি.কে হিট্টি) মতে সেই সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) এর মতো বলিষ্ট খলিফা না থাকলে ইসলাম বেদুঈন গোত্রদের সাথে মিশে গিয়ে অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত (History of Arab)। অর্থাৎ Had there been no Hazrat Abu Baker (R.) Islam would malted way compromise with the Bedwin tribes. যে কারণে হযরত আবু বকর (রাঃ) কে ইসলামের ত্রাণকর্তা বা Savier of Islam বলা হয়ে থাকে।

এদিকে মুসলমানদের দুনিয়া জুরে এত ঐতিহ্য ও গৌরব থাকলেও আজ মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত অনৈক্য, সংঘাত, বিভেদ, প্রতিহিংসা ও অন্তদ্বন্দ্বের সুযোগে বিধর্মী রাষ্ট্রগুলো কাশ্মীরের মুসলমান, মিয়ানমারের রাখাইনের মুসলমান, ফিলিস্তিনের মুসলমান, চীনের উইঘুর মুসলমানসহ আরও অনেক দেশের মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার ওপর উৎপীড়ন, নিপিড়ন, নির্যাতন ও খড়গ চালিয়ে যাচ্ছে। যে দৃশ্যপটে অশ্রু ধরে রাখা যায় না। যা মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধুকে বারংবার সামনে নিয়ে আসে। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ভারত থেকেও মুসলমানদের তাড়ানোর ব্যাপারে কুট কৌশল, ফন্দি ফিকির Calculated & preplanned সহ মুসলমানদের জানমাল ও নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যদি দুনিয়ার মুসলীম দেশ সমূহ ঐক্যবদ্ধ থাকত, তবে কোনো অবস্থাতেই মুসলমানদের ওপর এ নির্যাতন নেমে আসত না। ওআইসি (OIC) বা অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কাউন্সিল থাকলেও তাদেরও তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা নেই বলেও অনেকেরই সুস্পষ্ট অভিমত।

এ নিবন্ধে ইসলাম ও মুসলমানদের মহান সাধক, ইসলামের খেদমতগার, ত্যাগী ও নির্যাতিত হিসেবে যার নাম উপস্থাপন করা হচ্ছে, তিনি হচ্ছেন মহানবী (সাঃ) এর প্রেমিক ও সাহাবা হযরত বিলাল (রাঃ)। যিনি দুনিয়ার প্রথম মোয়াজ্জিন। যার আযানের সুমধুর ধ্বনি শুনে কাফেরদের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি হত এবং দলে দলে কাফেররা মুর্তি পূজা ত্যাগ করে ইসলামের সুশীতল পতাকাতলে সামিল হত। এছাড়া হযরত বিলাল (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ থেকে শুরু করে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ভূমিকা রাখার জন্য যার ওপর কাফেরদের অমানুসিক নির্যাতন ও হৃদয় বিদারক দৃশ্যপটের সীমা পরিসীমা ছিল না। বিভিন্ন গ্রন্থ, বিশেষত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী গ্রন্থ এবং ইসলামের প্রথম দিকের ঘটনা প্রবাহ ইতিহাসে হযরত বিলাল (রাঃ) এর দৈহিক বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা মতে কালো বর্ণের হযরত বিলাল (রাঃ) বেশ লম্বা এবং শক্তিশালী ছিলেন। তাঁর চুল কোঁকড়ানো এবং নাক ছিল চ্যাপ্টা। সেই সঙ্গে মোটা ঠোঁট এবং সাদা উজ্জ্বল চোখের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর দুই চোয়াল ছিল দাড়িতে পরিপূর্ণ। কুরাইশরা তাঁকে ইবনে সাউদা বা কালো মহিলার ছেলে বলে ব্যাঙ্গ ও তামাশা করত। তবে তার কন্ঠ ছিল অপূর্ব ও অদ্বিতীয়। তিনি অত্যন্ত শ্রুতি মধুর, ভরাট ও মিষ্টি কন্ঠের অধিকারী ছিলেন।

ধর্মের জন্য ত্যাগ স্বীকার ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করা এবং নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সামনে এগিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম নহে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও এক আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ আল হাবাসি (রাঃ)। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের ১০ বছর পরে ৫৮০ সালে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় জনবসতি “হেজাজে” জন্মগ্রহণ করেন হযরত বিলাল (রাঃ)। বিভিন্ন সূত্র মতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ৫৭০ সালে কাবাঘর তথা মক্কা আক্রমন করে তৎকালীন আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) থেকে আগত প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য। এই সৈন্যদের অগ্রভাগে ছিল বিপুল সংখ্যক হাতী। অথচ মহান আল্লাহ মক্কা তথা কাবাঘর বাঁচাতে আবাবিল নামক এক ধরণের ক্ষুদ্র পাখি প্রেরণ করেন। অসংখ্য আবাবিল পাখি মহান আল্লাহ নির্দেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর কণা হাতীর পালের ওপর নিক্ষেপ করে। উল্লেখ রয়েছে এই পাথর কণা যেখানে পড়ত সেখানে যেমন বিশাল গর্ত হয়ে যেত তেমনি হাতীর পাল ও সৈন্যরা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেত। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় আবরাহার বিশাল বাহিনী এবং পরাজয়ও বরণ করে থাকে। এ ঘটনা পবিত্র কোরআনের ১০৫ নং সূরা ফিলে বর্ণিত রয়েছে।

আবরাহার এই বাহিনীর আবিসিনিয়ার একটি গোত্রের রাজকুমারী ছিল হোমামা এবং তার স্বামী রাবাহ। যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার তৎকালীন প্রথা মোতাবেক এই দম্পত্তিকে মক্কার কুরাইশদের দাসত্ব মেনে নিতে হয়। দাস দাসী হিসেবে ঠিকানা হয় কুরাইশ নেতা উমাইয়া ইবনে খালফের ঘরে। কৃষ্ণাঙ্গ এই দম্পত্তির ঘরেই জন্ম নেন হযরত বিলাল (রাঃ)। দাস দাসীদের ঘরে জন্ম নেয়া শিশুদেরও তখন অমানবিক ও সামাজিক প্রথা হিসেবে মালিক বা প্রভুর দাসত্ব করতে হতো। তাই রাজকন্যার গর্ভজাত হয়েও হযরত বিলাল (রাঃ) উমাইয়া ইবনে খালফের দাসে পরিণত হতে হয়। হযরত বিলাল (রাঃ) ক্রীত দাস বাবা মায়ের সঙ্গে ক্রীতদাস হিসেবেই বেড়ে ওঠেন। তাদের মনিব বা প্রভু উমাইয়া ইবনে খালফ ছিলেন প্রভাবশালী কুরাইশ নেতা। এই উমাইয়ার ঘরেই কাজ করতেন হযরত বিলাল (রাঃ) এবং তার পরিবার। গৃহকর্মের পাশাপাশি দেবদেবীতে পরিপূর্ণ কাবাঘর ও তার আশেপাশের এলাকা রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করতে হত তাদের। ৬১০ সালে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নবুয়ত লাভ করেন। মক্কাবাসীকে দেবদেবীর পূজা ছেড়ে এক আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের আহবান জানানো হয়। কিন্তু বংশানুক্রমিকভাবে মূর্তি পূজায় এবং দেবদেবীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনের কারণে অহংকারী হওয়া কুরাইশগণ কিছুতেই দেবদেবীর পূজা ছেড়ে নিরাকার এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর আনুগত্য স্বীকারে সম্মত ছিল না। ফলে তারা ইসলাম গ্রহণের বদৌলতে ইসলাম প্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নানা ধরণের বাধা বিপত্তি সৃষ্টি করে থাকে। এমনকি দীনের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। এমনি এক প্রতিকুল পরিবেশে যে কয়েকজন মহান ও ত্যাগী নারী পুরুষ ইসলমের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে হযরত বিলাল (রাঃ) তাদের একজন।

কুরাইশদের চোখে একজন ক্রীতদাস হিসেবে হযরত বিলাল (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় তা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না কুরাইশ নেতা উমাইয়া। প্রথমত মুখের ভাষায় হযরত বিলাল (রাঃ) কে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার কথা বলা হলেও তা কোনে কাজে আসেনি। ফলে নির্মম নিগ্রহ অত্যাচার ও চরম নির্যাতনের পথ বেছে নেয় উমাইয়া ও কুরাইশরা। তবে সে অত্যাচারের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তার বর্ণনা আজও মানুষকে আতংকিত ও শিহরণ সৃষ্টি করে থাকে। প্রথম দিকে হযরত বিলাল (রাঃ) কে বেধে লাঠি ও চাবুক দিয়ে পেটানো হত। পালাক্রমে চলত চাবুকাঘাত। পরবর্তীতে তাহাকে বস্ত্রহীন শরীরে মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে হাত পা বাধা অবস্থায় শোয়ানো হত। বুকের ওপর গরম ও ভারী পাথর দেয়া হতো। গরমে তার চামড়া, গোস্ত, চর্বি পুড়ে হাড় বেড় হয়ে যেত। ক্রমাগত অত্যাচারে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। আবার জ্ঞান ফিরলেই তিনি বলতেন ‘আহাদ’। অর্থাৎ আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। আর এই একটি শব্দের উচ্চারণ (আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়) বন্ধ করার বিনিময়ে সব নির্যাতন বন্ধ করার প্রস্তাব দেয়া হত। এমনকি প্রকাশ্যে তা উচ্চারণ না করে গোপনে বা মনে মনে উচ্চারণের পরামর্শ দিত তাদের কেউ কেউ। অথচ এই অত্যাচারের পরও তার মুখ থেকে উচ্চারিত হত আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। হযরত বিলাল (রাঃ) এর ওপর এহেন নির্মম অত্যাচারের কথা জানতে পেরে মহানবী (সাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) কে যে কোনো মূল্যে হযরত বিলাল (রাঃ) কে তার মনিব উমাইয়ার কাছ থেকে ক্রয় করে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার পরামর্শ দান করেন।

ইতিহাসবিদ ও অন্যান্য সূত্রের আলোকে জানা যায়, তাহাকে (হযরত বিলাল (রাঃ)) মুক্ত করে আনার পর থেকে তিনি ছিলেন রাসুল (সাঃ) এর এক সার্বক্ষণিক সঙ্গী বা সাহাবা।

পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আযান দেয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন হযরত বিলাল (রাঃ)। আবেগঘন, সুরেলা ও মিষ্টি কন্ঠস্বরের জন্য হযরত বিলাল (রাঃ) কে আযান প্রদানের দায়িত্ব দেন মহানবী (সাঃ)। তাঁর আযান শুনে শুধু মানুষ নয় জিন এমনকি পশু পাখিরাও মুগ্ধ হত। সুনান আবু দাউদ (দাউদ শরিফ) হাদীস সংকলনের ২ নং বইয়ের ৫১৯ নং হাদীস মোতাবেক উরাওয়াহ ইবনে আজ যুবায়ের বলেন যে, হযরত বিলাল (রাঃ) যুদ্ধ ও ভ্রমনের সময়ও মহানবী (সাঃ) এর সঙ্গি হতেন এবং যথাসময়ে তিনি আযান দিতেন। ৬২৯ সালের শেষ এবং ৬৩০ সালের শুরুতে (হিজরি ৮ সালের ১০-২০ রমজান) মহানবী (সাঃ) এর নেতৃত্বে মদিনা থেকে আগত মুসলীম বাহিনী মক্কা নগরী তথা কাবাঘর দখল করে। কাবাঘর দখল সম্পন্ন হওয়ার পরপর মহানবী (সাঃ) এর নির্দেশে হযরত বিলাল (রাঃ) কাবাঘরের ওপরে ওঠেন এবং উচ্চস্বরে আযান দেন। এই আযান শুনে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠলে মহানবী (সাঃ) ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আহবানের কথাও হযরত বিলাল (রাঃ) এর দরাজ কন্ঠে শুনতে পান এবং কুরাইশরা দলে দলে ইসলামের পতাকা তলে শামিল হয়।

মক্কা থেকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ৬২২ সালে মদিনায় হিজরত করেন। মহানবী (সাঃ) এর একান্ত অনুরুক্ত ভক্ত ও সুহৃদ হযরত বিলাল (রাঃ)ও তাঁকে অনুস্মরন করে মদিনায় গমন করেন। মহানবী (সাঃ) এর নির্দেশে ইসলামের স্বার্থে তিনি প্রাণ উজার করে নানামুখী কাজে আত্মনিয়োগ করেন। হিজরি ২য় সালে (৬২৪) সালে মহানবী (সাঃ) এর অনুগত মদিনা বাহিনীর সাথে মক্কা থেকে আগত কুরাইশ বাহিনীর সাথে হেজাজে যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ নামে পরিচিত। বদরের যুদ্ধে শত্রু পক্ষের ১ হাজার পদাতিক সৈন্য ১০০ ঘোড়া আর ১৭০টি উটের বিপরীতে মুসলমানদের ছিল ৩০০ পদাতিক সৈন্য, ২টি ঘোড়া ও ৭০টি উট। এই যুদ্ধে কুরাইশদের পক্ষে ছিল উমাইয়া ইবনে খালফ। আর যার ক্রীতদাস ছিলেন হযরত বিলাল (রাঃ), মাতা হোমামা ও পিতা বারাহ। এই যুদ্ধে নতজানু হয়ে হযরত বিলাল (রাঃ) এর কাছে জীবন ভিক্ষা চাইতে থাকে এক সময়ের অত্যাচারী মনিব উমাইয়া ইবনে খালফ। যা বোখারি শরিফের তৃতীয় খন্ডের ৩৮ নং বইয়ের ৪৯৮ হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। এমনিভাবেই এক সময়ের ক্রীতদাস ফেরৎ হযরত বিলাল (রাঃ) এর হাতে প্রাণ হারায় অমানবিক নির্যাতনকারী পাষন্ড ও এক সময়ের প্রভু উমাইয়া ইবনে খালফ। বদরের যুদ্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), হযরত হামজা (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ও এরপরই হযরত বিলাল (রাঃ) দায়িত্ব পালন করে থাকেন। হযরত বিলাল (রাঃ) সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে শত্রু শিবিরে ত্রাস ও আতংক ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

৬৩ বছর বয়সে ৬৩২ সালের ৮ জুন রাসুল পাক (সাঃ) এর ওফাত হলে মহানবী (সাঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত প্রতিটি স্থানে হযরত বিলাল (রাঃ) কে এমন শোকাতোর করে তোলে যে, তাঁর পক্ষে মহানবী (সাঃ) বিহীন মদিনায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনি শোকাতোর পরিস্থিতিতে তিনি মদিনা ছেড়ে দামেস্কে চলে যান। এই দামেস্ক শহরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, অধিকাংশদের মতে ৬৪০ সালের ২ মার্চ তিনি ইন্তেকাল করে থাকেন। অনেকের মতে তিনি ৬৩৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁহার ইন্তেকালের পর দামেস্কের বার সাগির সমাধিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। সিরিয়ার কিছু অঞ্চলে এবং দুনিয়ার কিছু অঞ্চলে তাঁর কবর রয়েছে বলে স্থানীয় মুসলীমরা তা বিশ্বাস করে থাকে। এর মধ্যে জর্ডানের আম্মান শহরে হযরত বিলাল (রাঃ) এর নাম উর্দ্ধৃত করে একটি সবুজ গম্বুজসহ সৌধ রয়েছে বলে বিভিন্ন তথ্য, তত্ত্ব ও সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

রাজকুমারী হোমামা ও রাবাহর সন্তান হয়ে হযরত বিলাল (রাঃ) ক্রীতদাস থেকে মুক্তি পেয়ে নবীজী (সাঃ) এর সাহাবা হয়ে তিনি ইসলামের খেদমতে যে ত্যাগ ও নির্যাতন সহ্য করেছেন তা চিরস্মরণীয় ও অম্লান হয়ে থাকবে। এখান থেকে শিক্ষা নিলে এ কথাই বলা যায়, শুধু মুখে নয়- অন্তরে, কথায়, বাস্তবে ও ঈমান আকীদার সাথে প্রতিটি কাজে আল্লাহ রাসুল, কোরআন ও ইসলামের সুমহান দিক দর্শন পালন হোক আমাদের পাথেয়। ইসলামের জন্য ত্যাগ, মহানবী (সাঃ) এর সঙ্গী (সাহাবা) ও ইসলামের অতুলনীয় খেদমতগার হিসেবে হযরত বিলাল (রাঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আরও অফুরন্ত জানার ও শিক্ষনীয় অনেক বিষয় রয়েছে। যা হয়তো আমরা অনেকেই তা জানিনা। আমরা মুসলমান হিসেবে নিজেদের দাবী করলেও ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি না। যে কারণে দুনিয়ার অনেক বিধর্মী রাষ্ট্র মুসলমানদের মাথার ওপর চেপে বসেছে এবং অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।