একুশ শতকের গণতন্ত্রায়ণ ও বিশ্বায়ন বাস্তবতা

63
রায়হান আহমেদ তপাদার:

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন এখনো যথেষ্ট বেশি পিওর জরিপে ৩৮টি দেশে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ লোক মনে করে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা যে আইন প্রণীত হয়, এমন ব্যবস্থা উত্তম। কিন্তু গণতন্ত্রের বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন আছে, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়।প্রকৃত হুমকিটা হলো অপেক্ষাকৃত কম পরিণত বা অপরিণত গণতন্ত্রের বেলায়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল এবং গণতান্ত্রিক অভ্যাসগুলো জনগণের মধ্যে তেমন গ্রথিত নয়। তারপরও পাশ্চাত্যে যা ঘটে, তা এসব দেশকেও প্রভাবিত করে। আমেরিকা একসময় পদানত মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজ সেই আমেরিকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এমন এক ব্যক্তি বসে আছেন, যিনি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি তো পরের কথা, বরং বিরাগেরই শুধু জন্ম দিতে পারেন। নবীন গণতন্ত্রকে চারপর্যায়ে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে ঘটে স্ট্যাটাসকো নিয়ে জনগণের সত্যিকারের অভিযোগ ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। তুরস্কের ধর্মপ্রাণ সংখ্যাগরিষ্ঠরা সেক্যুলার এলিট শ্রেণির দ্বারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলে মনে করে এবং সেই কারণে বর্তমান ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট। কয়েক দশক ধরে বিজয়কেতন উড়িয়ে চলার পর গণতন্ত্র কি এখন পিছু হটতে শুরু করেছে? প্রশ্ন উঠছে এ জন্য যে, বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিয়েছে,যা থেকে বলা যায় যে,গণতন্ত্র আজ আর আগের অবস্থায় নেই।স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির আগে সামরিক শাসন ছিল বিশ্বরাজনীতিতে একটি অনিবার্য বাস্তবতা। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা অনেকটা কমে গেলেও তা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এখনো আফ্রো-এশিয়ার অনেক দেশেই সামরিক শাসনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সামরিক বাহিনী কোনো কোনো দেশে প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। দুটো কারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব স্নায়ুুযুদ্ধকালীন অবস্থা থেকে দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। 

পৃথিবীর প্রায় প্রতি প্রান্তে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এবং উন্নয়নশীল বহু দেশের সামরিক বাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। প্রাচীন কালের বা মধ্যযুগের বা আধুনিককালের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও চরিত্রগত বা কার্যক্রমগত কোনো পার্থক্য এদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। কারণ কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকই জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী নন। জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য বিভিন্ন উপাদান যেমন অবাধ, নিরপেক্ষ, মুক্ত ও স্বাধীন নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বা সরকার বাছাই করা জনগণের অধিকার, জনগণের সব মৌলিক ও নাগরিক অধিকার ভোগ বা শান্তিপূর্ণ জমায়েত ও সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কাজের প্রতিবাদ করার অধিকার অস্বীকার বা সীমিত করা, মাইনোরিটির অধিকারের স্বীকৃতি ও তার নিশ্চয়তা দেয়া এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ, আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা-এসব মৌলিক অধিকার কোনোকালে কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকই স্বীকার করেননি। বরং কীভাবে জনগণকে শৃঙ্খলিত করে শাসকের নিয়ন্ত্রণে ও কর্তৃত্বে রাখা যায়, সে চেষ্টাই নিরন্তর করে থাকেন কর্তৃত্ববাদী শাসকরা। বর্তমান যুগের শাসক ও উনিশ-বিশ শতকের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যে চরিত্রগত কিছুটা তারতম্যও রয়েছে। একনায়ক বা কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা গেলেও এসব শাসকের মৌলিক চরিত্র প্রায় একই। সর্বকালের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মূল চরিত্রই হলো, জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দেয়া; বাক্-ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ সব প্রকারের মৌলিক ও মিডিয়ার স্বাধীনতার অধিকার খর্ব করে দিয়ে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব বিষয়ের ওপর শাসকের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং সর্বক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী শাসকের সার্বভৌমত্ব কায়েম করা। যা কিছু হচ্ছে তা ওই কর্তৃত্ববাদী শাসকের বদৌলতেই হচ্ছে-এমনটা প্রচার করে শাসককে ইহজাগতিক প্রভুতে পরিণত করার এক প্রচেষ্টা এ ধরনের শাসনে লক্ষ করা যায়। 

একুশ শতকের পৃথিবীতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও শাসকের চরিত্র কেমন, সেটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে পল কাগামির বক্তব্য থেকে। আমার বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও আমার ভয়ে আমার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না এমন বক্তব্যের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী শাসনে জনগণের সর্বপ্রকার অধিকারহীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। যুগে যুগে কর্তৃত্ববাদী শাসকের আবির্ভাব হয়েছে পৃথিবীতে-এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে কর্তৃত্ববাদী শাসকের নির্মম পতনও প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। তা সত্ত্বেও কর্তৃত্ববাদী শাসকরা শিক্ষা নেননি কখনো। এমনকি নতুন নতুন অবাস্তব আদর্শ প্রচার করে এবং জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিতের দোহাই দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সমকালীন বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসকরা রাষ্ট্র শাসন করে গেছেন বা বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থায়ও তেমন ধরনের শাসকরা জনগণের ওপর কর্তৃত্ববাদ চাপিয়ে দিয়ে দেশ শাসন করে চলেছেন। রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামিকে এক পশ্চিমা সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার সমর্থকের সংখ্যা বর্তমানে কত শতাংশ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন? প্রত্যুত্তরে কাগামি বলেন, ৮০ শতাংশ। ২০ শতাংশ লোক আমার বিরোধী পক্ষে রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে বিরোধী পক্ষের ওই ২০ শতাংশও কিন্তু আমাকে ভয় পায় বিধায় একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আমার বা আমার শাসনের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস তাদের নেই। জনগণ জেনে-বুঝেও শাসকের প্রতি এক প্রকারের আনুগত্য প্রকাশ করে বলে মনে করা হলেও মূলত জনগণ ভয়ের মধ্যে থাকে বলেই শাসকের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি পর্যন্তও করে না। কেননা শাসক তার প্রতি আনুগত্য আদায় করার জন্য জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ করে জনগণকে অত্যাচার-নির্যাতন ও জেল-জুলুমের ভয় দেখিয়ে ভিন্ন মত দমন করে শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্য আদায় করার জন্য সচেষ্ট থাকে।

কাগামির মতানুযায়ী বিরোধী মতের লোকেরা শাসকের প্রতি টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না ওই ভয়ের কারণেই। পক্ষান্তরে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত এক শাসন ব্যবস্থা। যেখানে মানুষের সব প্রকার মৌলিক অধিকারের ওপর এক ধরনের ঘোষিত এবং অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় বলে মানুষের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হয়ে পড়ে। সর্বদাই শাসকের গুণগান করা কর্তৃত্ববাদী শাসনের এক মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। শাসকের বিরুদ্ধে যায়, এমন ধরনের সর্বপ্রকারের মত প্রকাশ ও প্রচারের অধিকার নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত থাকে বলে এ ধরনের শাসনাধীন সমাজকে ‘বদ্ধ সমাজ’ বলে অভিহিত করা হয়। বিশ শতকে গণতন্ত্রের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল বিশ্ব ব্যবস্থায়। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিল উন্নয়ন মডেলের একটি মৌলিক উপাদান। এর মধ্যেই জনগণের প্রকৃত মৌলিক অধিকারের বিষয়টি খোঁজা হয়েছিল। তাই দেশে দেশে ছিল গণতন্ত্রের জয়জয়কার। তবে একুশ শতকের পৃথিবীতে গণতন্ত্রের বিপরীতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাকে একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’-এমন একটি প্রচারণা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয়। ফলে বিশ্বের দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং পক্ষান্তরে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং বদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনে মানুষকে জোরপূর্বক বাক্হারা করার চেষ্টা করা হচ্ছে উন্নয়নের নামে। এসব দেশে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে একজন মাত্র শাসকের পদতলে নিয়ে এসে সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ক্ষুদ্র একটি পরিবার ও চক্রী দলের হাতে কেন্দ্রীভূত করে গণতন্ত্রের কফিনের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের মিনার। আর এখানে মানুষের সব অধিকার অস্বীকার করে শাসন ব্যবস্থার মিনারের চূড়ায় বসে থাকা শাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বলপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে জনগণের ওপর। জনগণের সমর্থন আছে কি নেই, সে সম্পর্কে ভ্রূক্ষেপ করা হয় না। 

যদিও জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই তাদের ক্ষমতার ভিত্তি বলে দাবি করেন; যদিও ক্ষমতায় টিকে থাকেন বিরোধী মতকে নির্মমভাবে দমন করে। যেমন তুরস্কের বর্তমান শাসক রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান একজন লোকরঞ্জন- বাদী একনায়ক। কিন্তু তিনি তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করে চলেছেন কঠোরভাবে বিরোধী মত দমন করে। একই কথা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের বেলায়ও প্রযোজ্য। কর্তৃত্ববাদী শাসনে দেশের সংবিধানকে এমনভাবে সাজানো হয়, যা একমাত্র শাসকের অনুকূল ক্ষেত্র সৃষ্টি করে মাত্র। সংবিধানের দোহাই দিয়ে শাসকরা রাষ্ট্রযন্ত্র এবং এর সব প্রতিষ্ঠানের ওপর অবাধ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। অর্থাৎ শাসক নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা- হীন করার লক্ষ্যে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যবর্তী সব প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিয়ে এর ওপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন ও কায়েম করেন, যাতে বাধাহীনভাবে শাসকের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। আধুনিককালের লোকরঞ্জনবাদী কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকরা নিজেদের সাধারণত চার স্তরবিশিষ্ট পিরামিডের সর্বোচ্চ চূড়ায় স্থাপন করেন, যেখানে শাসকই হলেন একমাত্র পূজনীয়; রাষ্ট্রের সবকিছুই পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয় একমাত্র শাসকের কর্তৃত্বে। যেমন সক্রিয়, অন্ধ অনুগত একদল সমর্থকগোষ্ঠী, বাহ্যত দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী জনগোষ্ঠী, সমর্থকগোষ্ঠী; যারা সত্যিকার ভাবেই বিশ্বাস করে শাসকের অধীনে দেশ ও জনগণের উন্নতি নিশ্চিত হয়েছে। এ ধরনের শাসনে এমন একদল লোকের উদ্ভব হয়, যারা শাসকের বদৌলতে সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধাভোগী এবং খুন, গুম, ভয়ভীতির কারণে একদল লোক শাসককে সমর্থন দিয়ে থাকে, শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এ ধরনের চার স্তরের মিনারের চূড়ায় বসে শাসক রাষ্ট্র ও সমাজের সবকিছু, বিশেষ করে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের মৌলিক অধিকারের সব উপাদান হত্যা করে এবং হত্যা করে সব বিরোধী মত ও পথকে। 

দীর্ঘকাল যে দেশের ভেতরে ও বাইরে গণতন্ত্রের পরিচর্যা নেই। ফলে যেসব ভূখণ্ডে গণতন্ত্রের ফুল ফুটেছিল, সেখানে আগাছা জন্মেছে, জঙ্গল এসে ফুলের বাগানে ঢুকে পড়েছে। তাই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুদিক থেকে গণতন্ত্র চাপের মধ্যে পড়েছে। ব্রাজিল, ভারত, আফ্রিকার দেশগুলো অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ ও সংকীর্ণতায় আটকে যায়। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলো স্বার্থনির্ভর হিসাব-নিকাশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যে ভূমিকা পালন করেছে, তাতে শতভাগ সততা ছিল না। রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের অত্যন্ত খারাপ সম্পর্ক ছিল। তুরস্কের অভ্যুত্থান থেকে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বেঁচে যাওয়ার পর রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের ভাটা পড়ে। প্রকৃত অর্থে পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে কর্তৃত্ববাদী ঐক্যের সৃষ্টি হয়। ব্রেক্সিটের পর চীন সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র পিপলস ডেইলির মন্তব্য হচ্ছে, এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের মৌলিক ভুলের ফসল। পরাশক্তি আমেরিকা গণতান্ত্রিক শাসনে বর্ণবাদ ও অসহিষ্ণুতা, সামাজিক জটিল সমস্যা নিরসনে ব্যর্থ। দ্য গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, পশ্চিমের সন্ত্রাসী হামলাগুলো আসলে গণতন্ত্র ধসে পড়ার ইঙ্গিত। এ বিষয়ে রবার্ট কেগান লিখেছেন, মানবসভ্যতার শাসনের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক শাসনের চেয়ে কর্তৃত্ব পরায়ণ শাসনের ইতিহাসই দীর্ঘ।বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ যদি বিবর্ণই হয়, তবে হয়তো পুরো বিশ্ব আর অভিন্ন সুরে গলা মেলাতে পারবে না। হয়তো এশিয়ার কিছু দেশ যে পথে এগোতে চাইবে, ইউরোপের দেশগুলো তাকে ভুল মনে করবে। অঞ্চলভেদে বদলে যাবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা। কোনো একক নীতিতে আর বিশ্ববাসী তাল মেলাতে চাইছে না। তবে তা ভালো হবে, নাকি মন্দ হবে সময়ই তা বলে দেবে। 

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক 
raihan567@yahoo.com