মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা প্রশমন ও আপস নেপথ্য

15
রায়হান আহমেদ তপাদার:

সংঘাত আর হানাহানি মধ্যপ্রাচ্যের পিছু ছাড়ছে না। ফের সেখানে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। কিন্তু থেমে থেমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে সশস্ত্র সংঘাত চলছে, তা ধ্বংস, হত্যা, ব্যাপ্তির নিরিখে বড় বড় যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। এমনকি, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, হানাহানি, রক্তপাত, মৃত্যু, উদ্বাস্তুকরণের সুদীর্ঘ ইতিহাস শতবর্ষ স্পর্শ করতে যাচ্ছে। ১৯৪০-এর দশকে আরব-ইসরাইল সংঘাতের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যে যে সঙ্কটের সৃষ্টি করেছিল, তা সমগ্র জনপদ ও জনগোষ্ঠীকে গ্রাস করেছে। বরং দিনে দিনে আরব-ইসরাইল তথা ইহুদি বনাম মুসলিম দ্বন্দ্বের জায়গা দখল করেছে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যকার মতাদর্শ ও জাতিগত সংঘাতের আত্মবিনাশী লেলিহান আগুন, যা মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব ও মুসলিম বিশ্বের বৃহদাংশকে পরিণত করেছে মৃত্যুর বিভীষিকাময় নরককুণ্ডে। এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন ও আপস মীমাংসায় যে অঞ্চলভিত্তিক উদ্যোগ, তার মধ্যেই আসলে যুদ্ধের সূত্রপাত হলো। ২০১৯ সাল থেকে ইসরায়েলও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গঠনে একটা বাস্তবভিত্তিক মীমাংসা নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হয়েছিল। এ আলোচনার অগ্রগতি যে ব্যাপক বা অগ্রগতি নিখুঁতভাবে এগোচ্ছিল, সে কথা হয়তো বলা যায় না। কিন্তু এবার ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আলাদা। এমনকি ১০ বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং এর জবাবে ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রভাব ছড়িয়েছে গোটা বিশ্বে। পশ্চিম তীর, জর্ডান ও মিসরের ফিলিস্তিন, লেবাননের হিজবুল্লাহ, তাদের অভিভাবক ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ সহিংসতা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থায়ও চিড় ধরাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকে কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। 

কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া তাদের জন্য ঠিক হবে না। বরং যুদ্ধ নিরসনে নতুন কোনো উপায় খুঁজে বের করার উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে তারা। ২০১৯ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্ত ছিল। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাবনতিশীল সম্পৃক্ততা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে অগ্রাধিকারের বদলে দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আব্রাহাম শান্তি চুক্তির আওতায় ইসরায়েল, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই স্বাভাবিক হতে থাকে। এ ছাড়া ২০২১ সালে কাতারের অবরোধ প্রত্যাহার,২০২৩ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস এবং চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এই কূটনীতির অংশ।ইয়েমেনের সঙ্গে আপস আলোচনা চলছিল। দশকের পর দশক ধরে গৃহযুদ্ধ ও বহির্বিশ্বের উসকানিতে চলা যুদ্ধে বিপর্যস্ত সিরিয়ার বাশার-আল-আসাদও আবার পুনর্বাসিত হয়েছেন। কাতার ও ওমান পরোক্ষভাবে ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে কাজ করেছে। ফলে যেসব মার্কিন নাগরিক ইরানে জিম্মি হয়ে ছিলেন, তাঁরা মুক্তি পান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল, সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে কথাবার্তা চলছিল। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় এ আলোচনা ভেস্তে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ইউরোপীয় অংশীদারদের অনেকেই ধারণা করছিলেন যে এ অঞ্চলে উত্তেজনা কমে এসেছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান বলেন, এ অঞ্চলে এখনো উত্তেজনা আছে। তবে ৯/১১-এর পর এ অঞ্চল নিয়ে তার পূর্বসূরিদের যে শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়েছে, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে।

ইতিপূর্বে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনে ইসরায়েল যে বড় চারটি হামলা চালিয়েছে, সে সময় আরব দেশগুলো যে রকম দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল কিংবা অনেক ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত ছিল, এবারও তাদের মধ্যে সে ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ইসরায়েল এবার আগের হামলাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক তৎপরতা নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলের এই নগ্ন গণহত্যা যদি এখনই বন্ধ না হয়, তাহলে তা আরব বিশ্বে ভয়ংকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত আরব দেশগুলোর সাধারণ মানুষ যখন অবরুদ্ধ ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর ইসরায়েলি হামলার জের ধরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, তখনই আরব নেতারা নড়েচড়ে বসেন। যদিও ফিলিস্তিনই আরবদের প্রধান ইস্যু ছিল এবং আছে, তথাপি আরব নেতারা এই বিষয় নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু গরম বক্তব্য দেওয়া বা বকবক করাকেই যথেষ্ট বলে মনে করে থাকেন। গত ১১ অক্টোবর কায়রোয় অনুষ্ঠিত আরব লিগের বৈঠকে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ‘উভয় পক্ষের’ হামলা ও বেসামরিক মানুষ হতাহত করার বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা দখলদারির শিকার এবং দখলদার-উভয়কেই এক কাতারে নিয়ে এসেছেন। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীকে একটি সর্বাধুনিক সমরসজ্জায় সমৃদ্ধ নৃশংস রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে এক পাল্লায় মেপেছেন। ভয়াবহ গণহত্যা শুরু করার মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের নাকবার পুনরাবৃত্তি করে ইসরায়েল যখন গাজাবাসীকে তাড়া করা শুরু করেছে, তখনো তাঁরা শান্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মিনমিন করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তবে গত ১৭ অক্টোবর গাজার আল-আহলি হাসপাতালে বোমা মেরে প্রায় ৪৭০ জন সাধারণ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার পর আরব ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের মানুষ যে মাত্রায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তা আরব দেশ গুলোকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছুটা শক্ত অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। 

এর কয়েক দিন পরই আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানাতে এবং ইসরায়েলি হামলা বন্ধে প্রস্তাব পাস করতে জাতিসংঘের সদস্যদেশ গুলোকে অনুরোধ করতে শুরু করেন। এই প্রস্তাবের পক্ষে বেশিরভাগ দেশের অকুণ্ঠ সমর্থন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল সে প্রস্তাবকে সামান্যতম পাত্তা দেয়নি। তারা বিশ্বের যা বলার আছে তা বলবে আর ইসরায়েলের যা করার আছে তা করবে নীতি অনুসরণ করছে। তারা কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে গাজায় স্থল অভিযান চালাতে থাকে এবং ৩৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ রেখে সেখানে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালাতে শুরু করে। ইসরায়েল বিশ্বাস করে, আরব দেশগুলোর নেতারা নিজের স্বার্থ নিয়ে নিজেদের মধ্যে এতটাই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছেন যে ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাঁদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দুঃখের বিষয়, তাদের সেই ধারণা বা বিশ্বাস মিথ্যা নয়। ফিলিস্তিনের প্রতি আরবদের সমর্থন বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭৯ সালে মিসরের তৎকালীন আনোয়ার সাদাতের সরকারের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তিচুক্তি হওয়ার পরই সেই সমর্থন হ্রাসের শুরু হয়েছিল। এর তিন বছর পর ইসরায়েল লেবাননে দখলাভিযান চালায়। সে সময় কোনো আরব দেশ লেবাননের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। ওই সময় লেবানন পিএলওকে তাদের ভূখণ্ড থেকে বহিষ্কার করে। এর সূত্র ধরেই লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনে হামাসের উত্থান ঘটে। আজকে হয়তো আরব নেতারা ফিলিস্তিনের বিষয়ে মুখ খুলতে চাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের মধ্যে খুব কম দেশেরই ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলা এবং কথামতো কাজ করার ক্ষমতা আছে। তবে এবার আরব নেতাদের মধ্যে যাঁরা নেতৃস্থানীয়, তাঁদের হয়তো মুখ খুলতেই হবে এবং তাঁরা যে তাঁদের কথাকে কাজে পরিণত করতে চান, তার প্রমাণও দিতে হবে। 

হামাসের এ যুদ্ধের পর বোঝা গেল,মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল, কিন্তু এ উদ্যোগ টেকসই ছিল না। সমুদ্রসীমা নিয়ে ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এ অঞ্চলে শূন্যের কোঠায়। বহিঃশক্তি কী করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগ ও অর্থনীতিতে নতুন সুযোগের অনুসন্ধান-এ নিয়ে আলোচনা চললেও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, হামাস ও হিজবুল্লাহকে ইরানের সমর্থন ইস্যুতে কখনোই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। বিরোধের পরপরই এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন হামাসের সমালোচনা করেছে। তারা দুই পক্ষের প্রাণহানিতে শোক প্রকাশ করেছে এবং সংলাপে উৎসাহ ও সমর্থন দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। গাজার সঙ্গে সীমান্ত থাকায় মিসরের পরিস্থিতি এখনই অস্থিতিশীল। তারা শান্তি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সমর্থন দেওয়ার কথা বলছে। সৌদি আরব ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারির বিষয়টিকে সামনে এনেছে, পাশাপাশি উত্তেজনা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়েছে বেসামরিক জনগণের জীবন রক্ষায়। কাতার, কুয়েত ও ওমান আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার বঞ্চিত করায় সমালোচনা করেছে ইসরায়েলের। কিছু ইতিবাচক সম্ভাবনাও দেখা যায়। কাতার জিম্মি মুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মিসর পরিস্থিতির আরও অবনতি যেন না হয়, সে নিয়ে কাজ করছে। তুরস্ক সমঝোতায় বসানোর উদ্যোগ নিতে চায়।সাম্প্রতিক সময়ে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তারা ঐক্যবদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে এ অঞ্চলের উত্তেজনা নিরসনে যে অগ্রগতি করেছিল, তার ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকা রাখার এটাই সময়।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক 
raihan567@yahoo.com