রাঙ্গুনিয়ার অধম্য মেধাবী-শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে মেধাবী হাসানের সাফল্য

125

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মো. হাসানের (১০) পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তার শরীরিক প্রতিবন্ধকতা। দূরারোগ্য ব্যাধি “মাসকুলার ডিসট্রপি” রোগে আক্রান্ত অবস্থায় দিনমজুর পিতার ঘড়ে জন্ম নেওয়া ছেলেটি মেধার স্বাক্ষর রেখেছে এবারের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি)। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে তার হাত-পা সহ সম্পূর্ণ শরীর অবসের মতো হলেও ঐ অবস্থাতেই লিখে পিইসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
পরীক্ষায় মোট ৬শ নাম্বারের মধ্যে সে অর্জন করেছে ৫৫৩ নাম্বার। প্রতি বিষয়ে তার প্রাপ্ত নাম্বার শতকরা ৮৫ নাম্বারের উপরে। এই দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও তার এমন সাফল্য রীতিমতো সবাইকে চমকে দিয়েছে।
মো. হাসান উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের লিচুবাগান এলাকার আবু তাহের ও হাছনা আক্তারের ছেলে। সে চন্দ্রঘোনা তৈয়্যবিয়া অদুদিয়া সুন্নীয়া মাদ্রাসা থেকে পিইসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে হাসানের শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তার বাবা বলেন, জন্মের পর ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতাম। কিন্তু তার মেধা, কঠোর পরিশ্রম আর সাফল্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সে স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে একজন ডাক্তার হবে।
ওই শিক্ষার্থীর মা হাছানা আক্তার বলেন, আর দশজন শিশুর মতো স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া-দাওয়া, গোসল সে করতে পারে না। এই বয়সেও তাকে চলার পথে সাহায্য নিয়ে চলতে হয়। কিন্তু পরীক্ষায় সে কারো সাহায্য ছাড়াই লিখে এই সাফল্য অর্জন করেছে।
তার মা আরও জানায়, তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনজনই এই দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্তান্ত। ইতিমধ্যে এক সন্তান এই রোগে আক্তান্ত হয়ে মারা গেছে।
এই রোগের ব্যাপারে রাঙ্গুনিয়া প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের চিকিৎসক এস এম নোমান বলেন, “মাসকুলার ডিসট্রপি” একটি বংশগত রোগ। এটি হলে মানুষের মাংসপেশি শুকিয়ে যায় এবং প্রতিবন্ধী হয়ে হাত-পা সহ শরীর অকার্যকর হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভোগেন এবং দৃঢ়ে দৃঢ়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। বিশ্বের প্রতি ৫ হাজার মানুষের একজন এই রোগে আক্তান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই রোগের চিকিৎসা এখনও দুর্লভ।’
মেধাবী হাসান এই রোগে আক্তান্ত হওয়ার ব্যাপারে তার বাবা জানান, জন্মের পর থেকেই এই রোগ দেখা দিয়েছে তার। চিকিৎসক বলেছে তার মায়ের কাছ থেকে বিশেষত ছেলেদের এই রোগ জন্মগত ভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তার ৪ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে ৩ ছেলেই এই রোগে আক্তান্ত। মেঝ ছেলেটা দীর্ঘ ৭ বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর ১২ বছর বয়সে মারা যায়। এখন ছোট দুই ছেলে এই রোগে আক্তান্ত। তাদের প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবা কেন্দ্রে এনে চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। এরআগে তাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ দেশের বড় বড় অনেক চিকিৎসকের কাছেও চিকিৎসা করিয়ে কোন লাভ হয়নি। দিনমজুরীর কাজ করে সন্তানদের এই চিকিৎসা করাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
চন্দ্রঘোনা তৈয়্যবিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তৈয়ব বলেন, “শিক্ষকতা জীবনে হাসানের মতো মেধাবী শিক্ষার্থী কমই দেখেছি। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর মেধা দিয়েই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা হাসান পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছে বলেও জানান তিনি।

পিইসি পরীক্ষা চলাকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদুর রহমান প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মাধ্যমে একটি হুইল চেয়ার উপহার দিয়েছিলেন। পরীক্ষায় ভাল ফলাফল অর্জনের পর তার পরিবারে গিয়ে স্কুল ব্যাগ, বই, শীতের কম্বল সহ বিভিন্ন সাহায্য করেন।
তার সাফল্য অর্জনের ব্যাপারে ইউএনও মো. মাসুদুর রহমান বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে পড়াশোনার পথে বাধা নয়, তার বড় উদাহরণ হাসান। সে পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে দেখিয়ে দিয়েছে ভাল ফলাফলের জন্য কঠোর অধ্যাবসায়ই যথেষ্ট। তাকে উপজেলা প্রতিবন্ধী সাহায্য ও সেবাকেন্দ্রে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা সহ সহায়ক উপকরণ ও শিক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। সে যাতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য সর্বাত্মক সাহায্য করা হবে।
পরনির্ভরশীল না হয়ে লেখা পড়া শিখে নিজেই কিছু করতে চায় মো. হাসান। নিজের স্বপ্নকে সত্যি করতে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে পড়াশোনা শুরু করেছিল সে। প্রথম দিকে সহজ না হলেও, সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে হাসান। তার এই পথচলায় সকলের দোয়া চেয়েছেন মেধাবী হাসান।