অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে চীন ও ইইউ

13

রায়হান আহমেদ তপাদার:

দুই বছর আগেই বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে ৩০ হাজার কোটি ইউরোর বিশাল বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বলা হচ্ছে, তাদের এই পরিকল্পনা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের (বিআরআই) প্রকৃত বিকল্প হবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন ‘গ্লোবাল গেটওয়ে স্কিম’ নামে এই মহাপরিকল্পনা সামনে এনেছেন। বিআরআই’র আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেল, সড়ক, সেতু, বন্দরসহ নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে মোটা অংকে অর্থায়ন করেছে চীন।তবে অভিযোগ রয়েছে, এর মাধ্যমে চীনের ঋণের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে দেশগুলো, যা থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশগুলোর প্রয়োজন বিশ্বস্ত অংশীদার। এ জন্য এখন ইইউ’র সদস্য দেশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত থেকে শত শত কোটি ইউরো জোগাড়ের চেষ্টা করছেন তারা। ভন ডার লিয়েন বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেখাতে চায়, একটি ভিন্ন গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন সব প্রকল্প দিতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টেকসই উন্নয়নে নজর দেবে। তার কথায়, প্রকল্পগুলো হতে হবে উচ্চ মানের। উচ্চমাত্রায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণসহ তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য বাস্তব ফলাফল প্রদানে সক্ষম হতে হবে। ইইউ’র এক কর্মকর্তা বলেছেন,তাদের এই মহাপরিকল্পনা- র প্রধান লক্ষ্য থাকবে আফ্রিকা কেন্দ্রিক। চীনের কৌশলগত পরিকল্পনার ছায়া এরই মধ্যে আফ্রিকা, এশিয়া, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, এমনকি ইউরোপেও পৌঁছে গেছে। চীনের কসকো কোম্পানি গ্রিসের পাইরাস বন্দরের দুই-তৃতীয়াংশের মালিক, আবার ক্রোয়েশিয়ার একটি প্রধান সেতু তৈরি করেছে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন ইইউ’র প্রেসিডেন্ট বলেন, বিনিয়োগে যখন পছন্দের কথা আসে, তখন হাতে থাকা অল্প কয়েকটি বিকল্পের মধ্যেও অনেক ছোট ছোট বিষয় থাকে, যার পরিণতি হয় অনেক বড়। হতে পারে তা আর্থিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে কিংবা সামাজিকভাবে। অবশ্য যাদের ঠেকাতে এত বড় পরিকল্পনা নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সেই চীনই বিষয়টিকে স্বাগত জানাচ্ছে। এক ব্রিফিংয়ে ইইউ’তে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং মিং বলেছিলেন, বেইজিং ইইউ’র গ্লোবাল গেটওয়ে পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাবে, যদি এটি উন্মুক্ত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়ক হয়। তিনি সতর্ক করে আরও বলেছিলেন, অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে যদি ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে এবং নিজেদেরই ক্ষতি করবে।হিসেব করলে দেখবেন ২০১৯ সাল খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের জন্য অবশ্যই এটা ভিন্ন যুগের সূচনা। কারণ পাঁচ বছর পর এটা ছিল শি চিন পিংয়ের প্রথম ইউরোপ সফর। এই পাঁচ বছরে বিশ্ব কোভিড মহামারির সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। চীনে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে এখনো কিছু রহস্য রয়েই গেছে। এ সময়ে বিশ্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনও দেখেছে। রাশিয়ার এই আগ্রাসনকে কৌশলগতভাবে সমর্থন দিয়ে চলেছে বেইজিং। এই সবকিছুর মানে হচ্ছে, ২০১৯ সালে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ যেভাবে চীনকে বিবেচনা করত, এখন তাতে ভিন্নতা এসেছে। এই পরিবর্তনের ব্যাপারে সজাগ শি চিন পিং খুব সতর্কতার সঙ্গে ইউরোপে তাঁর সফরসূচি ঠিক করেন। ফ্রান্স সফরের পর তিনি হাঙ্গেরি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয় এমন দেশ সার্বিয়া যান। শি চিন পিংয়ের ফ্রান্স সফর সম্পর্কে বলা হয়, চীনের সঙ্গে ফ্রান্সের বন্ধন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল। আর হাঙ্গেরি ও সার্বিয়া দুই দেশই ইউরোপে চীনের সমর্থক। শি চিন পিং সার্বিয়াকে চীনের নিরেট বন্ধু বলে প্রশংসা করেন। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কও বাড়ছে। এর মধ্যে সার্বিয়ার বায়ু, সৌর ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে চীনের ২২০ কোটি ডলার বিনিয়োগও করছে। ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে শি চিন পিংয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবান। তিনি শুধু চীনের সঙ্গে নয়, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে মনোযোগী। ওরবানের এই অবস্থান অন্যান্য সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান থেকে তাঁকে অনেক বেশি ভিন্নতা দিয়েছে। হাঙ্গেরি সফরের সময় শি চিন পিং, ভিক্তর ওরবানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, হাঙ্গেরি ইউরোপে চীনের বৈদ্যুতিন গাড়িসহ স্বয়ংক্রিয় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের মূল হাব। চীন নিয়ে ইউরোপ মহাদেশে সমসাময়িক যে মতামত, তার থেকে সার্বিয়া ও হাঙ্গেরির মতামত ভিন্ন। ইইউ’র মূল অবস্থান জানা যায় গত সোমবার ফ্রান্সে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেনের বক্তব্যে। চীন নিয়ে তিনি ডি-রিস্কিং বা ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যে বাণিজ্য না করার নীতি ঘোষণা করেন। শি চিন পিংয়ের এই সফরের সময় কাকতালীয়ভাবে প্যারিস ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তি হয়েছে। সি চিন পিংকে ফ্রান্স খুব উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। উরসুলা ভন ডার লেনের সঙ্গে শি চিন পিংয়ের আলোচনা হয়েছে।কিন্তু শি চিন পিংয়ের এবারের ইউরোপ সফরের রাজনৈতিক আবহ, পাঁচ বছর আগের সফর থেকে অনেক বেশি ভিন্ন। পাঁচ বছর আগের কথা চিন্তা করলে দেখা যাবে, শি চিন পিংকে গভীর ভালোবাসায় স্বাগত জানিয়েছিল ইতালি। জি-৭ ভুক্ত দেশের মধ্যেই ইতালিই প্রথম চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডস মহাপরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছিল। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব ইতালির এই সিদ্ধান্তকে তখনই বিতর্কিত বলেছিল। ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসন ইতালির সমালোচনা করেছিল। ইতালির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসেন। গত বছর তিনি চীনের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে, তাতে এটা অনিবার্য ছিল। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে পশ্চিমা বিশ্বের বড় অভিযোগ, জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর জনগোষ্ঠীর ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে চীন। আর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিয়ে চীন তার ইলেকট্রিক যানবাহন, ব্যাটারি, সৌর প্যানেলের গোভাগাড় বানানোর চেষ্টা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখানেই শেষ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা ক্রমাগত উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন যে চীন বাইরে থেকে ইউরোপের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। তাঁরা বলছেন, ইউরোপে ‘চীন ভাগ করো ও শাসন করো’ কৌশল নিয়েছে, যা কিনা মহাদেশটির সম্মিলিত স্বার্থ খর্ব করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ের প্রধান জোসেফ বোরেল এমন অভিযোগও করেছেন যে চীন ইউরোপে বিকল্প ধরনের সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজছে। যাইহোক, চীনের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি স্পষ্টতই কঠোরতর পথে হাঁটছে। এমনকি বেইজিং দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর যে বাণিজ্য ক্ষেত্রে সমন্বিত চুক্তি সম্পাদন করতে পেরেছিল, সেটাও ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। এই চুক্তি আটকে যাওয়ার পেছনে মূল উদ্বেগের জায়গা হলো চীনের আচরণ। চীন ইস্যুতে ইউরোপে আরও সুদৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও ২৭টি দেশকে একই ছাতার নিচে আনতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এই বিভাজনকেই সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে চীন। ইউরোপ সফরে প্রথম পা রাখেন ফ্রান্সের মাটিতে। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর থেকে রাশিয়ার প্রতি কঠোর অবস্থান নিলেও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বৃহত্তর ইস্যুতে চীনকে স্বাগত জানিয়ে আসছেন। যেমন, গত বছর ভন ডার লেনের সঙ্গে বেইজিং সফরের সময় এমানুয়েল মাখোঁ ডি-রিস্কিংয়ের বদলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধাদানের নীতির কথা বলেন। তাইওয়ান প্রশ্নে ফ্রান্সের অগ্রাধিকারের জায়গা থেকেও সরে আসেন তিনি। একই সফরে ভন ডার লেন যখন বলছেন, তাইওয়ান প্রণালির স্থিতিশীলতা আমাদের স্থায়ী গুরুত্বের জায়গা। সেই সময় মাখোঁ বলছেন, তাইওয়ান আমাদের সংকট নয়, ইউরোপীয়দের উচিত নয় আমেরিকানদের অনুসরণ না করা। চীন ও ফ্রান্সের মধ্যকার সাম্প্রতিক আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল, সেটা শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রও ঘনিষ্ঠভাবে নজরে রেখেছিল। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক মাস আগেই ফ্রান্স সফরসূচি চূড়ান্ত করেন।সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, শি চিন পিং তাঁর   ইউরোপ সফরকে মহামারির পর ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিন্যাস বলে আশা করতেই পারেন। যাই হোক, ফ্রান্স, সার্বিয়া ও হাঙ্গেরি সফর ছিল অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউরোপের সঙ্গে চীনের বৃহত্তর মৈত্রীর বিষয়টি শীতলই থেকে যাবে; বরং সেটা এ বছর আরও খারাপ হতে পারে। ইউক্রেন এবং গাজার যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক সংস্থান ক্রমেই কমে আসছে। সে কারণে চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোকে যুক্তরাষ্ট্র তার সর্বশেষ বিবেচনার বিষয় হিসেবে নেবে। কিন্তু চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি এ অঞ্চলে সংঘর্ষের আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সেই সংঘাত অধিকতর ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিমধ্যে চীনকে দক্ষিণ চীন সাগরে শক্তিশালী অবস্থান অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখানে চীনের এখন যে অর্জন, তা এক দশক আগেও পেতে চাইলে চীনের সর্বাত্মক যুদ্ধে না জড়িয়ে উপায় থাকত না। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাম্প্রতিক উসকানি এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থাকার পরও সি চিন পিং তাঁর সম্প্রসারণবাদ এগিয়ে নিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে চীনের আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদের লাগাম টেনে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনের নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চায়, সংঘাত চায় না’। কিন্তু চীন দক্ষিণ চীন সাগরে তার কৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং তার জন্য তারা সংঘর্ষের ঝুঁকি নিতেও রাজি আছে। দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর এখন মার্কিন সংকল্পের একটি পরীক্ষাস্থল হয়ে উঠেছে। আর এই পরীক্ষায় বাইডেন ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক raihan567@yahoo.com