মুক্ত চিন্তার নামে মগজ ধোলাইয়ে ব্যতিব্যস্ত সোশ্যাল মিডিয়া

8
রায়হান আহমেদ তপাদার:

বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব সমাজে খুবই শক্তিশালী একটি মাধ্যম হচ্ছে-সোশ্যাল মিডিয়া। এই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যেমন ভালো ভালো কাজ করা যায়, ঠিক তার বিপরীতে খারাপ কাজও কিন্তু করা যায়। যোগাযোগ ও বন্ধন এক নয়।সামাজিক মাধ্যম যোগাযোগ ঘটিয়ে দিচ্ছে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ যোগাযোগে কোনো বন্ধন তৈরি হচ্ছে না। বরং পারিবারিক, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কে যে বন্ধন রয়েছে,সেই বন্ধনেও শৈথিল্য দেখা দিয়েছে।প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি তৈরি হয়েছে, মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সভ্যতার আদি যুগ থেকেই মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক মাধ্যমের দৌরাত্ম্য মানুষের এ চিরন্তন পরিচিতির সামনে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সামাজিকতার অনুষঙ্গ হচ্ছে ভদ্রতা, সভ্যতা, আনন্দ, বেদনা ও সমবেদনায় পারস্পরিক বোঝাপড়া। ব্যক্তি নয়, সমষ্টিই এখানে বড় কথা।সামাজিক মাধ্যমগুলো এ সত্যকে অস্বীকার করে চলেছে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী যেন প্রত্যেক ব্যক্তি। একঘরে থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন, এক আড্ডায় থেকেও সবাই সবার কাছ থেকে দূরে। এভাবে সমাজে জন্ম নিচ্ছে বিচ্ছিন্নতা ও অসহিষ্ণুতা।সামাজি কমাধ্যমেও এরই প্রতিফলন দেখা যায়। ফেসবুকের কথাই ধরা যাক। সবচেয়ে জনপ্রিয় এ সামাজিক মাধ্যমের শক্তিমত্তা সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ শক্তির অপব্যয়ই বেশি হচ্ছে। বিদ্বেষ, রুচিবিকৃতি ও উগ্রবাদ ছড়ানোর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ফেসবুক। ধর্ম ও জেন্ডারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অনেকেই শালীনতার সীমা অতিক্রম করেন। তারকা বা বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তির চরিত্র হননের পালা শুরু হলে বিপুল উৎসাহে সেখানে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন। ট্রলের মাধ্যমে বিপন্ন করে তোলেন সেই ব্যক্তির জীবন। 

সামাজিক গণমাধ্যম এক অর্থে সমাজের দর্পণ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমান সমাজে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক চিন্তার মানুষ যে বেশি এটি ফেসবুকের বদৌলতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। দ্য ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডলসেন্ট হেলথ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে যুক্তরাজ্যের ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সি প্রায় ১০ হাজার কিশোর-কিশোরীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। গবেষকরা দেখেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে, তাদের উত্ত্যক্ত করার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে এবং তাদের ঘুম ও শারীরিক অনুশীলন হ্রাস করে। এর ফলে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা, দুশ্চিন্তা, অশান্তি ও হতাশা তথা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করছে। গবেষণাটির সঙ্গে জড়িত ইউসিএল গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের গবেষক রাসেল ভিনার এক বিবৃতিতে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিজে ক্ষতির কারণ নয়, তবে নিয়মিত এগুলো ব্যবহার ঘুম ও ব্যায়ামের মতো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা কার্যকলাপ গুলোতে বাধা সৃষ্টি করে এবং ক্ষতিকারক ক্রিয়াকলাপে কিশোর-কিশোরীদের সংস্পর্শ বাড়িয়ে তোলে, বিশেষ করে সাইবার-উত্ত্যক্তের মতো নেতিবাচক কার্যক্রমে। এর আগে ২০১৭ সালে রয়্যাল সোসাইটি অব পাবলিক হেলথ ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি দেড় হাজার কিশোর-কিশোরীর ওপর একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রাম তাদের মনে সবচেয়ে বেশি হীনম্মন্যতা এবং দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে। ১০ জনের মধ্যে সাতজন বলেছে, ইনস্টাগ্রামের কারণে তাদের নিজেদের দেহ নিয়ে মন খারাপ হয়েছে। তরুণ-তরুণীদের অর্ধেকই বলেছে, ফেসবুকের কারণে তাদের মানসিক দুশ্চিন্তা ও অশান্তি বেড়ে গেছে। দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা বলেছে, ফেসবুকের কারণে সাইবার বুলিং বা অনলাইনে অপমান-হয়রানি বা উত্ত্যক্ত করার প্রবণতা আরো গুরুতর আকার নিয়েছে। 

মোবাইল রিপাবলিক নামের একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ২০১৩ সালের জুনে ভারতের বিভিন্ন এলাকার ৮০০ মানুষের ওপর জরিপ চালিয়েছিল। জরিপের ফল বলছে, ভারতে মানুষের মধ্যে বই পড়ার হার ক্রমাগত কমছে। এমনকি সংবাদপত্র পড়ার হারও কমছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে দৈনিক পড়া বলতে তারা ওই টুকটাক সংবাদপত্রই পড়েন।সেটাও পড়েন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ওই জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই খবর পড়েন, যেহেতু বেশিরভাগ সময় এই মাধ্যমে থাকেন তারা। ৭০ শতাংশ বলেছেন, তারা রেডিট থেকে খবর পড়েন। ৬৬ শতাংশের সরল স্বীকারোক্তি, ফেসবুক থেকে খবর পড়েন তারা। ৫০ শতাংশ বলেছেন টুইটারের কথা। ৩১ শতাংশের বক্তব্য, টাম্বলার ব্যবহার করেন তারা। ২৩ শতাংশ বলেছেন ইনস্টাগ্রামের কথা। ২১ শতাংশের ঝোঁক ইউটিউবের দিকে। আর ১৯ শতাংশ মানুষের মত, তারা খবর পড়া কিংবা অন্য যাবতীয় পড়ার বিষয় লিংকডইন থেকেই পড়েন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যাদের বয়স ২১ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। গত বছরের জানুয়ারিতে রিসার্চ গেট জার্নালে প্রকাশিত হয় তাদের সেই গবেষণা। ওই প্রবন্ধে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী দিনের বেশির ভাগ সময়ই ফেসবুক-টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটান। ফলে বই পড়ার জন্য তেমন সময় পান না তারা।এতটা সময় তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী করেন? এ প্রশ্নের উত্তরও মিলেছে গবেষণায়। ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, চারপাশে ঘটে যাওয়া খবর ও তথ্য জানতে তারা ফেসবুকে সময় কাটান। ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ বন্ধু ও শিক্ষকদের সঙ্গে একাডেমিক তথ্য বিনিময় করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ান। আর ৩৩ শতাংশের ভাষ্য, তারা ফেসবুকে থাকেন শুধু বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করার জন্য। 

আর ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ সারা দিন শুধু ছবি আপলোড করেন ফেসবুক-টুইটারে। ৯ দশমিক ৯ শতাংশের বক্তব্য, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকেন তারা।আর ৭ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর মন্তব্য, সমমনা ব্যক্তিদের নিয়ে ফেসবুকে গ্রুপ তৈরি করেন আর নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। মার্ক জাকারবার্গ ও ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি খাতের কর্তাব্যক্তিরাই এখন ‘সবচেয়ে বড় স্বৈরশাসক বলে মন্তব্য করেছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া রেসা। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসাকে ২০২১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের শাসনামলে বিভিন্ন মামলায় কয়েক বছর ধরে ভুগতে হয়েছে মারিয়া রেসাকে। সেই লড়াই চালিয়ে আসা মারিয়া রেসা বলেছেন, মার্ক জাকারবার্গের তুলনায় দুতার্তে অনেক ছোট স্বৈরশাসক ছিলেন। ইলন মাস্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের পাওয়েজ শহরে হে সাহিত্য সম্মেলনে বক্তব্যে এ বিষয়ে কথা বলেন মারিয়া রেসা। তিনি বলেন, জাকারবার্গ ও মাস্ক এটা প্রমাণ করেছেন যে সংস্কৃতি, ভাষা বা ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে আমাদের সবার মধ্যে মিলই বেশি রয়েছে অমিলের চেয়ে। কারণ, একইভাবে আমাদের সবার মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। আমরা কীভাবে উপলব্ধি করি, তা বদলে দেওয়ার সক্ষমতা আছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গুলোর। ফলে তা আমাদের বিশ্বকে দেখার পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে এবং আমরা কীভাবে পদক্ষেপ নিই, সেটাও পাল্টে দিচ্ছে। অনলাইনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ এ ধরনের যেকোনো বিষয়ে আলোচনা করলে, তা বিশ্বজুড়ে একই ধরনের মেরুকরণ তৈরি করেছে। এসব বিতর্ক সেসব প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে যেগুলোকে ‘আমরা মুক্ত চিন্তা বলে মনে করি’, কিন্তু সেগুলো আসলে তা নয়। 

ফিলিপাইনে বিরোধটা ধনী ও গরিবের। যুক্তরাষ্ট্রে এই বিরোধ বর্ণের।'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের প্রসঙ্গে বলাই যায়, এটা উভয় পক্ষের জন্য বোমা ফাটানো বিষয় হয়ে উঠেছিল। সব মানুষকে একটি জায়গায় আনা এর লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল গোলমাল তৈরি করার জন্য আরও বিস্তৃত পরিসরে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে মেরুকরণকে উসকে দিচ্ছে, ভয় ও ক্ষোভ এবং বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে,তা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে বদলে দিচ্ছে। আমাদের ওপর প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, তা কমানোর দুটি উপায় রয়েছে, আর তা হচ্ছে: যুক্তরাষ্ট্রকে ১৯৯৬ সালের কমিউনিকেশনস ডিসেন্সি অ্যাক্টের ২৩০ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আইনের এই ধারায় এসব কোম্পানিকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকেরা যে আধেয় পোস্ট করবেন, তার জন্য ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো মামলা থেকে সুরক্ষা পেয়ে আসছে আইনের এই ধারায়। আপনার যদি শিশুসন্তান থাকে তাহলে তারা যথেষ্ট বড় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে দেবেন না। কারণ, এটা স্বল্প আকারে হলেও নেশার মতো হয়ে ওঠে। 
অবক্ষয়ের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। সর্বোপরি আমাদের যুবকদের মাঝে ধর্মীয় চেতনা জাগিয়ে তোলা আবশ্যক। সেটা যে ধর্মেরই হোক না কেন। কারণ কোন ধর্মই আমাদের নৈতিক অবক্ষয় শিখায় না। আমাদের যুবকদের জন্য সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হতে হবে তাদের পরিবার। যাতে সে কোনো ভালোবাসার অভাবে নতুন ভালোবাসা না খুঁজে। বাবা-মাকে আমাদের ছেলেমেয়েদের জানাতে হবে তার দৌরাত্ম্য কত। মানে তার সামাজিক অবস্থান থেকে সে কী করতে পারে আর কী পারে না।

শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজনে শাসন ও তাদের থেকে কাম্য। কারণ যিনি ভালোবাসেন শাসন সেই করতে পারেন। বাবা-মাকে খোঁজ রাখতে হবে, কে বা কারা আমার ছেলে বা মেয়ের বন্ধু হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারে আমরা কী করতে পারি না, সে শিক্ষা আমাদের পরিবার থেকেই পাওয়া উচিত। ছেলেমেয়েদের মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মায়েদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ছেলে বা মেয়ে কোনো ভুল করে ফেললেও তাকে কাছে নিয়ে আপন করে আবার নিজেকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে। উপরোক্ত দিকগুলো থেকে আরো ভালো অনেক দিক আমাদের জানার বাইরে আছে যা আমাদের খুঁজে নিয়ে আমাদের সন্তানদের মানুষ করে সকল নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে হবে।আমাদের খারাপ দিকগুলোকে আমরা চিহ্নিত করে যদি আমাদের তরুণদের সামনে তুলে ধরতে পারি, তাহলে এটা আমাদের জন্য অভিশাপ নয় আশীর্বাদ হবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক 
raihan567@yahoo.com