“জিরো যখন হিরো”

89

প্রদীপ কুমার দেবনাথ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট : বর্তমানের চারপাশটা কেমন বিদঘুটে, ছন্নছাড়া, শ্রীহীন, পাশবিকতা, অনাচার, অত্যাচার, অবিচার, শোষণ, বিশ্বাসহীনতা ও ধর্মান্ধতায় পরিপূর্ণ। সাধারণের মন অসাধারণ হওয়ার প্রতিযোগিতায় ভরপূর। সীমাহীন লোভ ও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার বাসনা মানুষকে লাজলজ্জা, ভয়, ভদ্রতা, বিনয়, সামাজিকতা, উদারতা, সম্মানবোধ সবকিছু থেকে যোজন দূরে সরিয়ে দিয়েছে। 

কেমন যেন মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে যন্ত্রমানবে রুপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে মানুষগুলো। বিবেক, আবেগ, স্নেহ, ভালবাসা কোনকিছুই নাড়া দিচ্ছে না বেশিরভাগ মানুষকে। 

শোষকদের শোষণে অতিষ্ঠ শোষিতরা নিষ্পেষিত হয়ে এক পর্যায়ে পাষণ্ড হয়ে যাচ্ছে। অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে সমাজ, সংসাত্যাগীরা চরম অপকর্মের মাধ্যমে নিজেদের ফেরারী হিসেবে পরিচিত করছে। 

সমাজ, পরিবার, ব্যবসা ও রাজনীতি প্রতিক্ষেত্রে অপাত্রে কন্যাদান বা বানরের গলার মুক্তোর মালা পড়ানো হচ্ছে। এতে শ্রেণি বিভেদ তৈরি হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। পরিণামে বিভক্ত হচ্ছে সবকিছু। পরিবারে, সমাজে, ব্যবসা ও রাজনৈতিক্ষেত্রে চরম ফাটল অস্থিরতা তৈরি করছে সর্বত্র। এক সময় একের সুখে অন্যজন সুখী হত আবার একজনের দুঃখে অন্যজন দুঃখী হতো। 

এখন সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিনিধিত্বকারী, বিভিন্ন সেক্টর নিয়ন্ত্রণকারী বড় বড় কর্মকর্তা, বস বা মালিকগণের সাথে দুরত্ব প্রায় সকল অধীনস্থদের। 

প্রশ্ন হতে পারে দায়ী কে? উত্তরটা কিন্তু কঠিন নয়। আমাদের বিশ্বাসহীনতা, নিচু মন-মানসিকতা, ধর্মের নামে নিজস্ব চিন্তাচেতনা সহজ সরলদের উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজের তৈরী উদ্ভট, কল্পিত, বাস্তবতা বর্জিত মতামতকে নিজ জনপ্রিয়তা পূঁজি করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া, কল্পিত কাহিনি বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা, লোভ দেখিয়ে নিজের করে নেওয়া এখন একপ্রকার প্রথা। 

রাজনৈতিক দৈন্যতা, সকলের নেতা হওয়ার প্রতিযোগিতা, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার স্বপ্ন, মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা, দাম্ভিকতা, অভদ্রতা দলের প্রতি আনুগত্য কমিয়ে দেয়। 

ফলে, নিজ দলের নেতাকে এড়িয়ে চলা, নেতাকে অসম্মান করা, গ্রুপিং – লবিং তৈরি করা এখন নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কিছু নেতা বা কর্মীর মনে সন্দেহ, অবিশ্বাস নিজ এলাকার সাংসদ বা এমপির নিকট থেকে দূর করে দিচ্ছে কিছু লোককে। 

আবার দেখা গেছে নেতৃত্ব বদল হলে পুরাতন বা বয়স্ক নেতারা তাদের আগের নেতার জন্য মায়াকান্না করতে করতে দলের সভাপতি কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান করে। আসলে এসবের পিছনে সুনির্দিষ্ট কোন কারণ নেই। 

আস্তে আস্তে দলে নবীনদের প্রাধান্য পায় যা আরও বেশি ঈর্ষার তৈরী করে এবং একসময় দলে বিভক্তি প্রকাশ্য না হলেও নিরবে চলতে থাকে। সন্দেহপ্রবন নেতা-কর্মীদের ভীড় বেড়ে যায় কেন্দ্র কর্তৃক মনোনীত নেতা বা সাংসদের বিরুদ্ধে। 

বর্তমানে লক্ষ্য করে দেখুন এদেশে চলমান সরকারের বিরুদ্ধে ঠিক এই দলেরই সন্দেহপ্রবন নেতা-কর্মীদের এবং দলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না পাওয়ার বেদনায় নিষ্ক্রিয় নেতা-কর্মীরা বিএনপি – জামাত চক্রের আস্থাভাজন হয়ে যাচ্ছে এবং তারা মূল দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যদলের নেতা – কর্মীদের মাধ্যমে শিরোনামহীন আইডি খোলে অবিরাম অপপ্রচার, গুজব, উসকানি ও বাজে ভাষার প্রয়োগ করে নিকৃষ্টভাবে ক্ষমতাসীন দলের ভাল ভালো নেতাদের এমনকি মাননীয়   প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও কুৎসা ও কলঙ্কজনক কথা বার্তা লিখছে। আর তারা মত প্রকাশের মূল মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফেইসবুককে। চোখ বুলালে দেশের শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি বা সরকারি দায়িত্ব পালনকারী গুরুত্বপূর্ণ নিউজ বের হলেই ঐসব নেতা কর্মীদের ফেইক আইডি থেকে অবিরত বাজে মন্তব্য, অশালীন ভাষা, তীর্যক আক্রমণ চলতে থাকে। আর এগুলোতে সরকার দলীয় বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ওদেরকে অপভাষা প্রয়োগ করে দেশে বিদেশে বাংলা ভাষার মতো এত আকর্ষণীয়, মজার ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাটির অমর্যাদা করছে নিয়মিত। 

বিচ্ছিন্ন নেতা – কর্মীদের প্রতি বিনীত অনুরোধ রইল হয় নিজ দলের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস থাকলে দলে ফিরে আসুন আর না থাকলে প্রকাশ্যে দল থেকে সরে দাঁড়ান। 

প্রিয় পাঠকগণ বুঝতেই পারছেন আমি কার কথা বলছি? হ্যাঁ আমি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের অভিমানী নেতাদের উদ্দেশ্যে সুস্পষ্ট ভাবেই বলছি। 

আপনাদের অনক্যের সুযোগে জিরোরা হিরো হচ্ছে। সুযোগ নিচ্ছে সুবিধাবাদী শোষক শ্রেণি। উপায়ান্তর না দেখে এমপি মহোদয়গণ তাদেরকেই প্রাধান্য দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অতীতে যাদের কোন দলেই মুল্যায়ণ হতোনা তাদের অতীত অপকর্মের জন্য তারা আজ সরকার দলের হিরো হচ্ছে। যাদের অবস্থান রাজনীতিতে সবসময়ই জিরো ছিল আপনাদের কারণে তারা আজ হিরো। আর এ কারণেই দল হয়ে যাচ্ছে জনবিচ্ছিন্ন।  এর জন্য শতভাগ আপনারা দায়ী। 

এখনও সময় আছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ঐতিহ্যের প্রিয় দলকে টিকিয়ে রাখতে মনের ক্ষোভ, যন্ত্রণা, দুঃখ, আবেগ ঝেড়ে ফেলে এলাকার সাংসদ ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সুসংগঠিত থাকুন। সরকারের পা পিছলিয়ে গেলে প্রথম ভুক্তভোগী আপনিই হবেন। কারণ, জিরো থেকে হিরোরা ঠিকই নিজেদের বদলিয়ে নতুনভাবে নিজেদের আসন দখল করবে। আর আপনি অস্তিত্ব হারিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে যাবেন। নিজ পরিবারের দুর্নাম করলে যেমন আঘাতটি নিজ পরিবারের প্রিয় ব্যক্তির উপর আসে, তেমনি নিজ দলের ক্ষতি করলে আপনিও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। তাই অপাত্রে কন্যাদান করে কাউকে জিরো থেকে হিরো বানানোর মতো বোকামি ছেড়ে নিজেকে ও নিজ দলকে ভালবাসুন।