ভোটারদের আস্থাহীনতা ও সিটি নির্বাচন প্রেক্ষাপট

45

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু, লেখক কলামিষ্ট : নিবন্ধটির আলোকপাত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি, দল, প্রতিষ্ঠান সরকারি ও বেসরকারি কোনো কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়। তা হচ্ছে বেসামাল কথা, ভোটারদের আস্থাহীনতা ও সিটি নির্বাচন প্রেক্ষাপট নিয়ে। দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে। যা অনেক সময় বাস্তবতার আলোকে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়ে উঠে না। তারপরও অনেক সমস্যার সমাধান দূর করা অমূলক কিছু নহে। দরকার লাগামহীন ও বেসামাল কথার সংযম ও তীর্যকতা পরিহার পূর্বক ধৈর্য্য ও শালীনতা বজায় রাখা। কথা, কাজ, প্রতিশ্রুতির সমন্বয়, ভালো মনমানসিকতা ও ইচ্ছার প্রতিফলন। কিন্তু পূর্বাপর অবস্থা দৃষ্টে অনেকেই মনে করে বেসামাল, লাগামহীন কথা ও আস্ফালনের যেমন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না তেমনি যেকোন পর্ষদে নিজের শুদ্ধাচারের কথা চিন্তা না করে অহরহ যেন অন্যকে নিয়েই ঘৃতাগ্নি ও চর্বিত চর্বন করা হয়ে থাকে। যা অনেক সময় ধান ভানতে শিবের গীতের মতই মনে হয়। তদোপরি অনেক সময় যে কোন কর্মশালা ও অনুষ্ঠানে গিয়েও দেখা যায় বেসামাল, লাগামহীন, তীর্যক বড় বড় কথা, ভাগম্বরিতা, অসারতা, তোয়াজ ও তোষামোদের যেন গড্ডালিকা প্রবাহ। বাস্তবে এসব হম্বি, তম্বি ও কথার মিল না থাকাতে দেখা গিয়েছে আস্থাহীনতা, মিথ্যাচার, অনিয়ম ও কানার দৃশ্যপট। ফলশ্রুতিতে আস্থাহীনতাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদোপরি অর্বাচীন, বেসামাল, লাগামহীন বড় বড় কথা ও আশার বাণী শুধু যেন ব্রেকেটে বন্দী হয়েই পড়েছে। আস্থাহীনতার অফুরন্ত উদাহরণের যেন আর শেষ নেই।

দেশের বিটিভিসহ অনেকগুলো টিভির চ্যানেল ও সংবাদপত্র রয়েছে। এসব প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তথ্য প্রকাশ ও প্রচারে যখন বৈপরিত্য দেখা যায়, তখন সংগত কারণেই অনেক সময় এসব কিছু মেনে নিতে যেমন অসুবিধা হয় তেমনি আস্থাহীনতা ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়াও অমূলক কিছু নহে। দিনের পর দিন আস্থাহীনতার সংকট ও সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করার কারণেই অহরহ আস্থাহীনতার মহা সংকটে ও সমস্যায় যেমনি হাবুডুবু খেতে হচ্ছে তেমনি হিমশিমও পোহাতে হচ্ছে।

এক সময় জেলা পর্যায়ের একজন নবাগত কর্মকর্তার পরিচিতি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ওই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন এই অফিসেরই একজন কর্মকর্তা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঞ্চালক যোগদানকৃত নতুন কর্মকর্তাকে এমনভাবে তোয়াজ, গুণকীর্তন, প্রশংসা, তৈল মর্দন, ভূয়সী প্রশংসা করে উপস্থাপন করে, যা দেখে অনেকেরই মনে হল আকাশ থেকে কোনো দূত যেন মর্তের মাটিতে নেমে এসেছে। যোগদানকৃত কর্মকর্তা ও তার পরিচিতি অনুষ্ঠানে নিজের প্রশংসা ও অফুরন্ত গুণকীর্তন জাহির করলেন। যা শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই অবাক ও বিস্মিত। তিনি প্রথমেই বললেন, টাকার প্রতি আমার কোন লোভ লালসা ও মোহ নেই। জনগণের সেবাই তার উদ্দেশ্য। এমনকি ব্রিটিশ মেট্রোপলিটন পুলিশের জনক রবার্টফীলের একটি উক্তি টেনে বললেন, পুলিশই জনতা এবং জনতাই পুলিশ। তাছাড়া জাতিসংঘের শান্তি মিশনে গিয়ে কী ধরণের মারহাবা অর্জন করেছেন তাও বললেন। পরে জানা যায়, ওই কর্মকর্তা আয়ের সাথে সংগতিহীন ও অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা অর্জন ও দুর্নীতির অভিযোগে

দুদকের দায়েরকৃত মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে বন্দী দিনযাপন করছে এবং চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত (ওএসডি) হয়েছে। জনগণের মাঝে আস্থাহীনতার এমন অহরহ ঘটনা ও উদাহরণের যেন কমতি নেই।

১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের আগে ২৫ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সিটি নির্বাচন উপলক্ষে ইভিএম সম্পর্কে বলেছিলেন, ভারতের তুলনায় ১১ গুণ বেশী দামে ইভিএম কেনা হয়েছে। এ মেশিনে অডিট ট্রেইল বা ডিভিপ্যাট নেই। ফলে যাকে ভোট দিয়েছে তার পক্ষে পড়েছে কি না বা প্রয়োজনে পূণগণনার সুযোগ থাকে না। ডিভিপ্যাট না থাকায় ইভিএম ম্যানুপুলেট করা যায় বলে তিনি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও আস্থাহীনতা প্রকাশ করে থাকেন। তারপরও প্রধান নির্বাচন কমিশানর (সিইসি) কে.এম. নূরুল হুদা তা আমলে না এনে সিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে অনড় অবস্থানে থাকেন। অপরদিকে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ২০/০১/২০২০ ইং এক আনঅফিসিয়াল (ইউও) নোটে সিইসিকে বলেছিলেন, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে আচরণবিধি লংঘনের ব্যাপারে একের পর এক অভিযোগের মুখে রিটার্নিং কর্মকর্তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে আছেন বললেও তাদের কাজ দেখতে পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেছিলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা না নিলে কমিশনের প্রতি জনগণ ও ভোটারদের আস্থার সংকট নিরসন সম্ভব হবে না এবং আস্থাহীনতার সংকট বা সমস্যা সৃষ্টি হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, সিটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কে জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হবে এবং কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা জনসমক্ষে প্রতিভাত হবে (বাংলাদেশ প্রতিদিন ২১/০১/২০২০)। গণমাধ্যমে প্রকাশিক সংবাদ থেকে জানা যায়, ২২ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন, ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) যদি ৫০ শতাংশ ভোট না পড়ে তাহলে ব্যালট পেপারে আবার ভোট গ্রহণ করা উচিত। এ জন্য নির্বাচনী বিধি বিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। তিনি আরও বলেছিলেন, যেকোন নির্বাচনে ৫০ ভাগ ভোট না পড়লে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। এজন্য বিশ্বের অনেক দেশে ৫০ শতাংশের কম ভোট পড়লে আবার নতুন করে ভোট গ্রহণ করা হয়।

ইংরেজীতে অ্যাপাথি বলে একটি শব্দ আছে, যার বাংলা অর্থ অনীহা, অনাগ্রহ, উদাসীনতা। যাকে আস্থাহীনতা বললেও অত্যুক্তি হওয়ার মতো তেমন সুযোগ না থাকারই কথা। জানা যায়, ২০০৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডে একটি সাধারণ নির্বাচন হয়। বিভিন্ন কারণে এ নির্বাচনটি নানাবিধ প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দেয়। এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দিয়েছিল বিরোধী ডেমোক্রেট পার্টি। গোলযোগের কারণে ৩৭৫টি নির্বাচনী এলাকার ৬৯টিতেই ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। এক পর্যায়ে আদালত এ নির্বাচন বাতিল ঘোষনা করে থাকে। এমনই প্রেক্ষাপটে থাইল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিখেছিলেন নির্বাচনেই যদি দুনর্িিত হয় তবে নির্বাচন নির্ভর গণতন্ত্র হয় প্রতারণা। ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের রাজধানী দিল্লীর বিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৭.৪৭ শতাংশ। দিল্লীর বিধান সভার ৭০টি আসনের মধ্যে ৬৭ আসন পেয়ে দিল্লীর মসনদে বসে আম আদমী পার্টি, আর মূখ্যমন্ত্রীর ভূমিকায় আসীন হয় এককালের ট্যাক্স কর্মকর্তা ৪৭ বছর বয়স্ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ২ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় মিউনিসিপ্যাল অব দিল্লীর নির্বাচন। এ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ৫৩.৫৮ শতাংশ ভোটার। আর নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্টতা পায় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ইভিএম ব্যবহৃত এ নির্বাচনে কারিগারি অভিযোগ তোলে কংগ্রেস ও আম আদমী পার্টি। ২০১৬ সালের ৫ মে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় মেয়র নির্বাচন। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৪৫.৩ শতাংশ। এ নির্বাচনে প্রথম রাউন্ডে প্রদত্ত ভোটের ৪৪.২ আর দ্বিতীয় রাউন্ডে ৫৬.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয় পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত ৪৬ বছর বয়স্ক ব্রিটিশ মুসলমান সাদিক আমান খান। ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জার্মানির রাজধানী বার্লিনের মেয়র নির্বাচিত হয় তৎকালীন ক্ষমতাসীন জোট ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জার্মানীর প্রার্থী মাইকের মূলার। এ নির্বাচনে ৬৬.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানী মস্কোর মেয়র নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৩০.৯১ শতাংশ। এ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৭০.১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী সার্জিয় সিমাইয়ো নোভিচ নিন নির্বাচিত হয়। ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন। এ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি সংক্রান্ত সব তথ্যই ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত। নির্বাচন কমিশন সূত্রে বলা হয়, ভোট পড়েছে ২৭.১৫ শতাংশ। বাংলাদেশের রাজধানীর ভোটের এ চিত্র ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশ্ব যখন উন্নয়ন রোল মডেল খ্যাত বাংলাদেশের রাজধানীর সচেতন ভোটারদের মেয়র নির্বাচনের এ তথ্য দেখবে, তখন অনেকেই হয়তো বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে নতুন ভাবনায় না পড়ার কথা নয়। থাইল্যান্ডের র‌্যাগসিট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চ্যানচাই চিতলত্তর পর্নের লেখা দি রিলেশনশিপ বিটুইন দি ইলেকশন এন্ড ডেমোক্রেসি (নির্বাচন ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক) শিরোনামে ১ জানুয়ারি ২০১৫ সালে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ইন্টার ডিসিপ্লিনারি রিসার্চ। প্রবন্ধটিতে তিনি তুলে ধরেছেন যে, নির্বাচন হলো গণতান্ত্রিক ধারার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অন্য কথায় নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রতীক। নির্বাচনেই যদি দুর্নীতি হয় তবে নির্বাচন নির্ভর গণতন্ত্র হয়ে যায় প্রতারণা। এ প্রসঙ্গে এক ডজন কারণ উল্লেখ করা হয় তার প্রবন্ধে। যার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই এদেশের অনেক নির্বাচনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটারের কম উপস্থিতি সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) সাখাওয়াত হোসেন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের নির্বাচন সম্পর্কিত মন্তব্য ৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়ে থাকে।

তাতে ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) এম. সাখাওয়াত হোসেন উল্লেখ করেন, সরকার দাবি করছে ৮৫ শতাংশ লোক তাদের সমর্থন করে। তা হলে এই ভোটগুলো গেল কই ? কেন ১৩-১৭ শতাংশ ভোট নিয়ে মেয়র হতে হবে। তার মতে ইভিএম না হলে আমরা বুঝতে পারতাম না, কত শতাংশ মানুষ সিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ভোটাররা হয়তো মনে করেছেন ভোট দিয়ে লাভ নেই। কারণ ভোটের আগে কেন্দ্র দখল ও ভয়ভীতির কারণে মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেতে চায়নি। নির্বাচনের অফিসিয়াল তথ্য মতে এবার দুই সিটি নির্বাচনে ভোট পড়েছে ২৭.১৫ শতাংশ। শাহদীন মালিক বলেছেন, মূলত তিন কারণে ভোটার উপস্থিতি কম। ভোটাররা মনে করেছেন, যে মার্কাতেই আমি ভোট দেই না কেন এটি গণনা করা হবে নির্দিষ্ট একটি মার্কায়। ভোট দেয়া বা না দেয়া একই কথা। কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার পর শান্তিতে, নির্বিঘ্নে কোনো ধরণের হেনস্তা ব্যতিরেখে ফিরে আসতে পারা যাবে কি না সেটি নিশ্চিত নয়। এক্ষেত্রে ভয়ভীতি ও হুমকি কাজ করছে। ইভিএম নিয়ে বিএনপি যে প্রচারণা চালিয়েছে তাতে এই সিস্টেমের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়েছে। সামগ্রীক বিশ্লেষণে বলা যায়, ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। অর্থাৎ আস্থাহীন তাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অনেকেরই অভিমত নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের অনেকের আস্থা এখন প্রায় শূন্যের কোটায়। তারা মনে করে ভোট দিয়েও এর প্রতিফল বা ফলাফল মিলবে না। তাই ভোট দিলেই কী লাভ, আর না দিলেই বা কী লোকসান। কম সংখ্যক ভোট পড়াতে এ ফ্যাকশনটা যথেষ্ট কাজ করেছে বলেও অনেকেরই ধারণা। সিইসি নিজে ভোট দিতে গিয়ে ইভিএমের বিড়ম্বনার দৃশ্যপট কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়।

দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৮৫ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৮৩৮ জন। যা মোট ভোটের ২৭ শতাংশ। এ ধরণের ভোট গ্রহনের চিত্র নজির বিহীন। ২০১৫ সালে দুই সিটির নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪২.৯৩ শতাংশ। ৪২ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৮ ভোটারের মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৬৫ জন ভোট দিয়েছিল। এবারের নির্বাচনে দুই সিটিতে নতুন ১৮টি করে ৩৬টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়েছে। সেদিক দিয়ে ভোটের সংখ্যা বেশী হওয়ার কথা থাকলেও ৩ লাখ ৫০ হাজার ভোট কম পড়েছে।

সংগত কারণেই অনেকে মনে করে থাকে নির্বাচন কমিশন একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নহে। স্বাধীনতার এত বছর পরও বিভিন্ন দফতর, পরিদপ্তর, অধিদপ্তর, শাসন, প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেক্টরে কাজের চেয়ে গলাবাজি, বড় বড় কথা, বেসামাল ও লাগামহীন কথার প্রতিযোগিতাই বেশী চলছে। তদোপরি ইংরেজী অ্যাপাথি শব্দের বাংলা অর্থানুসারে অনীহা, উদাসীনতা ও আস্থাহীনতার যে উদাহরণ রয়েছে তা দিন দিন বৃদ্ধি হওয়া ছাড়া তা কমতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদি লাগামহীন কথা ও আস্থাহীনতার সংস্কৃতি দূরীভূত না হয় তবে তা দেশ, জাতি, জনগণ, রাজনীতি ও কারও জন্য মঙ্গল বয়ে না আনারই কথা। অ্যাপাথি নামক অনীহা, অনাগ্রহ, উদাসীনতা বা আস্থাহীনতা থেকে যদি ফেরা যায় ততই মঙ্গল। তা না হলে এ অ্যাপাথি এক সময় দাবালন, সোনামি, গোর্কির তান্ডবের ন্যায় নির্বাচনসহ অন্যান্য প্রত্যাশা অর্জনে দৃশ্যমান হলে হয়তো বলা বা করার কিছু অবশিষ্ট নাও থাকতে পারে। কাজের চেয়ে বেশী বেসামাল, লাগামহীন কথা এবং নিজে শুদ্ধাচার না হয়ে অন্যকে আত্মশুদ্ধির উপদেশ ও কথা বললে তা ভূতের মুখে রাম নাম জপারই নামান্তর। অনীহা, অনাগ্রহ, উদাসীনতা বা আস্থাহীনতার পরিবর্তে আস্থা অর্জনে সামনে চলাই হোক প্রতিশ্রুতি।

আস্থা অর্জনের মাধ্যমে যেভাবে মন জয় করা যায় তেমনি আস্থাহীনতা হলে দইকে যেমন চুন মনে করে ভয় কয়া হয়, তেমনি ভূক্তভোগী ন্যাড়াও বারবার বেলতলায় যেতে চায় না। সিটি নির্বাচনে ভোটারদের এত কম উপস্থিতিতের মূল্যায়ন করলে সার্বিক বিবেচনায় এর জন্য দায়ী প্রতিশ্রুতির অভাব, বেসামাল, লাগামহীন কথা, ইসি ও সিইসির প্রতি আস্থাহীনতার অভাবই বড় সমস্যা বলে অনেকেই মনে করে থাকে। পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশনার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন ও গণতন্ত্র একই বৃন্তের অংশ। যদি এর ব্যর্থয় ঘটে এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুতে গ্যাংরিন বা পচন ধরে তবে দুঃখ, বেদনার আর কিছু অবশিষ্ট না থাকারই কথা। কোনো ভূক্তভোগী, ভোটার বিহীন নির্বাচন, অনিয়ম, দানব, রাক্ষস, ভূত কানার তদারকি ও নির্বাচনের নামে গণতন্ত্র হত্যার আয়োজন বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। সুষ্ঠু, অবাধ, স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই জনপ্রত্যাশা। তদোপরি বাংলাদেশের সংবিধান (ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ) স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণের নির্বাচনের প্রতিভু। এর বাইরে যাওয়া সংবিধান পরিপন্থি ও অবজ্ঞারই নামান্তর।