ধর্ষকের হাতে কি জিম্মী আমরা

95

শেখ বিপ্লব: এখন আর সকালে ঘুম থেকে উছে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে প্রত্রিকা পড়তে বসে না। এইটাও কিছু মানুষের অভ্যাসে পরিনিত হয়ে ছিল আবার কেউ এটাকে বদভ্যাসও বলে থাকে। আবার এটা কখনো কখনো বিরক্তের কারনও হয়ে উঠে স্ত্রীর কাছে। পত্রিকা পড়ার জন্য অনেকেরি অফিসে বিলম্ব হয়ে যেত। বসের বকুনিও খেতে হত সময় সময়ে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যেমন রক্ষা পেয়েছে স্ত্রীরা হাতে তালপাতার পাখা, এখন মাথার উপর ঘুরে ইলেক্টিক পাখা।
তেমনি ঘুম থেকে উঠে এখন আর কেউ বলে না পত্রিকাটা দাও তো। হাতে হাতে স্মার্ট ফোন থাকায় যখন যেখানেই ইচ্ছে পত্রিকা দেখা যায়। তবে মধ্যরাতেই এ কাজটা বেশি হয়। যার কারনে স্বামী স্ত্রীর মাঝে সকালের চেয়ে গভির রাতের ঝগড়াটার স্থায়ীত্ব আর মধুরতা দুটাই বেশি থাকে। স্বামী সংসার নিয়ে স্ত্রীরা যতটা চিন্তিত না তার চেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছে কন্যা সন্তানকে নিয়ে। মধ্যরাতে স্মার্ট ফোনে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ও পত্রিকার শিশু ধর্ষন, গৃহবধু ধর্ষন, কলেজ হোস্টেলে শিক্ষার্থী ধর্ষনের খবরটা মাকে আরো বেশি ভাবায়।
যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। ইদানিং মেয়ের নিশ্চয়তার কথা ভেবে মেয়েদের বাহিরে রেখে উচ্চ শিক্ষা দিতে অনিহা প্রকাশ করছে। এমন একটি পরিবারের সাথে কথা হয় কত ২/৩ দিন পূর্বে। সদ্য এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে এক মেয়ে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। পরিবারের সবার ইচ্ছা ডাক্তার হবে। ঢাকায় মামার বাসায় থেকে লেখা পড়া করে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় মা বাবার কাছে আসছে। বড় মেয়ে বিয়ের পরেই বৈশি^ক মহামারী করোনার কারনে ঘর বন্ধী হয়ে পড়ে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্বামীর সাথে ঘুরতে যাবে সিলেটে। সব প্রস্তুুতি রাতেই সম্পন্ন সকালে ঘুম ভাঙ্গে মায়ের ফোন কলে। তোমরা কোথায় ? জামাই বাবাজি কে দাও। শ^াশুরীকে সালাম দেয়ার আগেই, বাবাজি তোমরা সিলেট যাবে না। গত কাল স্বামীর সাথে সিলেট এমসি কলেজে ঘুরতে গিয়ে তরুনী গনধর্ষনের শিকার হয়েছে। ফজরের নামাজের পর তোমার বাবার মোবাইলে নিউজ দেখিয়েছে।
এবার আপনারাই বলুন এমন কোন দিন কি পেয়েছেন পত্রিকার পাতায়,কিংবা টিভির পর্দায় ধর্ষনের সংবাদ নেই। প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে ছাত্রীকে ধর্ষন, এসএমএস করে ডেকে নিয়ে স্কুল শিক্ষার্থীকে গণধর্ষন। বাসে যাত্রী ধর্ষন, হাসপাতালে কিশোরী ধর্ষন, মন্দিরে পূজারী ধর্ষন, মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ধর্ষন, রাজধানীতে ৫ বছরের শিশু ধর্ষন, যাত্রাবাড়ী বাসে তরুনীকে গণধর্ষন,নোয়াখালির বেগমগঞ্জে স্বামীকে বেধে রেখে নিজ ঘরে স্ত্রীকে ধর্ষন বিবস্ত্র করে বেধরক মারধর করে ভিডিও ধারন,ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষন,স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষনের পর পুলিশ সদস্য গ্রফতার, দুই কিশোরীকে দল বেধে ধর্ষন। এতো গেল অল্প কয়েকটা সংবাদের শিরোনাম। এর পর কি বলতে পারি না, ধর্ষকের কাছে কি জিম্মী আমরা বা ধর্ষকের কাছে কি জিম্মী সোনা বাংলা ?
কাকে বাদ দিব বাবা,চাচা,দাদা শ^শুর,জামাই,শিক্ষক,পুলিশ,সেনাবাহিনী সরকারী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদ্রাসা-মন্দির-ইমাম-হুজুর-পুরোহিত এখন ধর্ষক। রাস্তা-ঘাট ঝোপঝাড়,মসজিদ-মন্দীর, শিক্ষা প্রতিষ্টান, বাস,ট্রেন, লঞ্চসহ, অভিযাত হোটেল সব কিছুই এখন ধর্ষকের অভয়ারন্য।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিম কেšদ্র (আসক) এর তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে জানুয়ারী থেকে আগষ্ট পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছে ৮৮৯ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ধর্ষিত হচ্ছে প্রায় ৪ জন। ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জন, ধর্ষনের শিকার হয়ে আতœহত্যা করেছে ৯ জন,ধর্ষনের চেষ্টা করা হয়েছে ১৪২ জনকে।
একই সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্ভর পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৩৭৪ টি। এর মাঝে একক ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৮৬টি। গণধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৮টি। সংস্থাটির তথ্য মতে ২০১৫ সালে সারা দেশে একক ধর্ষন ৪৮৪ টি, ২৪৫টি গণধর্ষন। ২০১৬ সালে ৪৪৪টি একক ধর্ষন ১৯৭টি গণধর্ষনসহ মোট ৬৫৯টিধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালে সারা দেশে ধর্ষনের সংখ্যা দাড়ায় ৮১৮টি। যে খানে ৫৯০টি একক ধর্ষন ২০৬টি গণধর্ষনের ঘটনা ছিল। ২০১৮ সালে একক ধর্ষন ৫০২টি ও ২০৩টি গণধর্ষনের ঘটনা ঘটে যা আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কম ৭৩২টি ঘটনায় এসে দাড়ায়। আসকের মতে গত ৫ বছরের ধর্ষনের রেকর্ড ভেঙ্গেছে ২০১৯ সালে ওই বছর সারাদেশে ১৪১৩ নারী ও শিশু ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। তার মাঝে গণধর্ষন ৩২৭টি একক ধর্ষন ১ হাজার ৬৬টি।
প্রতিবেদন সূত্রে আরো জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ২৪৬ জনকে,ধর্ষনের কারনে আতœহত্যা করেছে ৪৮ জন।
আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে গত আট বছরে সারাদেশে ধর্ষনের ঘটনা ঘটে ৮ হাজার ৭৮টি। ধর্ষনের পর হত্যা ৬২৬ জনকে। ২০১৯ সালে সারাদেশে ধর্ষনও গণধর্ষনের ১ হাজার ৬০৭টি। আর ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৭ জনক। এমন তথ্যে দেখে নিজেই আতংকিত হই। প্রশ্ন জাগে এক সাগর রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমে অর্জিত সোনার বাংলা কি ধর্ষকের হাতে জিম্মী ?
ধর্ষনের কারন জানতে গিয়ে-কেউ বলছে পোশাক আবার কেউ বলছে ধর্মীয় শিক্ষার কথা। ধর্মীয় পোশাক পড়ে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে গিয়ে ধর্মীয় শিক্ষকের ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে অহরহ আমরা দেখছি। এও দেখতি পাচ্ছি ৬-৭ বছরের শিশু ধর্ষনের ঘটনা তাদের ক্ষেত্রে আমরা কি বলবো পোষাক না ধর্মীয় শিক্ষা। ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে পোশাকও পড়ে এখন কি বলবেন ? বিধবা ৬০ উর্দ্ধ বৃদ্ধা ধর্ষনের ঘটনা বা ঘর থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষন এটাকে কি বলবেন ?
আবার অনেকেই মন্তব্য করেছেন,বিকৃত মন-মানসিকতা, মাদকের প্রভাব, স্মার্ট ফোনে অবাদ পর্নোগ্রাফি, আকাশ সংকৃতির প্রভাব, পারিবারিক যথার্থ শিক্ষা সর্বোপরি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মভীরুতার অভাব বলে চিহিৃত করে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য জন সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ও দ্রুত বিচার নিশ্চীত করা। না হলে সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন,নারী সংগঠন গুলোকে যতই ততপর থাকুক না কেন ধর্ষন প্রতিনিয়ত বেড়েই যাবে। এক পরিসংখানে বলা হয়েছে,দিন দিন ধর্ষনের হার বেড়েই চলেছ্ েএর প্রধান কারন কি ? নিঃসন্ধেহে বলা যায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। যেমন ধরা যাক আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা থেকে শুরু করে বনানী দ্যা রেইনট্রি হোটেলে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া ছাত্রী ধর্ষনের ঘটনাসহ অনেক ধর্ষনের মামলা। দীর্ঘসূত্রতার কারনে হিসাবে অনেকই বলেছেন,ধর্ষন সংক্রান্ত আইনে ত্রুটি,পলিশি তদন্তে ত্রুটি বা অবহেলা,ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা,প্রভাবশালীদের চাপ ও সামাজিক কারন। কোন ধর্ষনের ঘটনায় দেশ ব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টি না হলে দ্রুত পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও কিছুটা গড়িমসির আবার আলোচিত মামলা গুলোর অদৃশ্য কারেন ধীর গতি ইত্যাদি ইত্যাদি। সোনার বাংলাকে মহামারীর মত জেকে ধরেছে ধর্ষন নামের এ ব্যাধি। পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য সূত্রে জানা যায়,সারা দেশে ধর্ষন ও নারী নির্যাতনের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মামলা ঝুলে রয়েছে। এ সব মামলার বিচার চলছে ধীর গতিতে। বছরে নিস্পত্তি হচ্ছে ৩.৬৬ শতাংশ মামলা। আর সাজা পাচ্ছে হাজারে সাড়ে চারজন, সাজার হার ০.৪৫ শতাংশ।
এ ব্যাধি থেকে আমাদের করনিয় সম্মিলিত সদিচ্ছা। বিচারহীনতার সংকৃতি থেকে বের হয়ে ধর্ষন সঙক্রান্ত মামলাগুলো বিচার করতে হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। রাজনীতিক দল ও প্রশাসনকে হতে হবে জিরো টলারেন্স। জাবত জীবন আর অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড দন্ডীত হলে এর সমাধান নয়। তাই প্রচলিত আইনকে সংস্কার করে আরো কঠিন শাস্তীর বিধান করতে হবে। ধর্ষন একটি অয়ঙ্কর অপরাধ, একজন ধর্ষিতা যে ভাবে হায়েনাদের কাছে নির্যাতিত হয় তেমনি সারা জীবন সমাজের কাছেও নির্যাতিত হতে হয়, হেয় হতে হয়। সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে ধর্ষনের কঠিন আইন রয়েছে যেমন চীনে ধর্ষনের শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলেও পরিস্থিতি বুঝে তার যৌনাঙ্গ কর্তন করা হয়। উত্তর কোরিয় ফায়ারিং স্কোয়াড। ইরান, আফগানিস্তন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গুলি বা ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা। সৌদি আরবে জনসমুক্ষে শিরচ্ছেদ।
ধর্ষন প্রতিরোধে দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে প্রতিষ্টান প্রধানের জবাবদিহাতার সিসটেম চালু করতে হবে। সর্বোপুরি সামাজিক ও রাজনীতিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই। না হলে নারী শিক্ষার উপর কঠিন প্রভাব পড়বে। সে জন্য ধর্ষনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে যার যার অবস্থান থেকে।