লিচু গাছে কেরে, হুজুর আমি পাহারাদার মধু

58

লেখক কলামিষ্ট , এ.কে.এম শামছুল হক রেনু : ঘুষ, দুর্নীতি, অবক্ষয় দিনের পর দিন বেসামালভাবে সমানে এগিয়ে চলছে। যা দেখে মনে হয়, পাহারাদার ও রক্ষকই ভক্ষক হয়ে যেন ক্ষেত খায়। যাতে রয়েছে হরিবল, কালু, মধু, বড় হুজুর ও এক শ্রেণীর খাংসারপারদের দুর্নীতি, আত্মম্ভরিতা ও বাহাদুরী। এসব কিছু এক সময়ের কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া, মহামারী ও বর্তমান ডেঙ্গু বিস্তৃত এডিস মশারই নামান্তর। এক সময় বাতাস ভবনের কথা অনেকেই শুনেছে। ক্যাসিনোর ঘটনা থেকে অসংখ্য অঘোষিত আকাশ ভবনের কথাও শুনা যায়। যা এখন দেশের গণমাধ্যম, মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ফেসবুকে প্রায়ই দেখা যায়। অনেকেই সাংবাদিক ও মিডিয়ার লোকদিগকে বলে থাকে, স্বাধীনতার এত ত্যাগ, অর্জন যেন ভুলন্ঠিত ও হারিয়ে যেতে বসেছে। দুদক ঘুষ দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্তদের হাতে নাতে ধরলেও আইনের মারপ্যাচে বাঘা, বাঘা দানব, গডফাদার, ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজরা অনেক সময় রেহাই পেয়ে যায়। অনেক সময় অজ্ঞাত কারণে ব্যাংক, বীমা, শেয়ার বাজার কেলেংকারী ও ক্যাসিনোর সাথে সম্পৃক্ত অনেকেরই আদালতের বারান্দাতেই যেতে হয় না। তদোপরি অনেক সময় বড় হুজুরদের ঘুষের টাকা সম্পর্কে কিছু না জেনেও, শুধু টাকাগুনে দেয়ার অপরাধে অনেক অধঃস্তনদের বেকায়দায় পড়লেও নাটের গুরু বড় হুজুরদের বেঁচে যাওয়ার কথা কম শুনা যায়নি। তদোপরি ঘুষ, দুর্নীতি, উদ্ধার অভিযানে কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতসারে এমন কেহ অভিযানে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যে কারণে ঘুষ, দুর্নীতির ধারক, বাহক, গডফাদার ও রাঘব বোয়ালদের অনেকেই আগেভাগে জেনে যাওয়ার কথাও কম শুনা যায়নি। ফলে সরিষায় ভূত থাকাতে অনেকেই ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। জানা যায়, অফিসের অনেক বড় হুজুর বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে অনেক সময় যথাসময়ে কর্মস্থলে আসেনা। এমনকি তাদের নাকি নিয়মিত হাজিরা খাতায় উপস্থিতির স্বাক্ষরও করতে হয় না। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের পর অফিসে এসেও অধঃস্তনদের হাজিরা দেখে কোনো কারণে কারও ১/২ মিনিট বিলম্বের অজুহাতে লাল কালি, অনুপস্থিত, এ দিনের বেতন মওকুফ ও তলব করার কথাও শুনা যায়। ইহাই বাস্তবতা হলেও, বড় কর্তার নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা না আসার কারণ কারও না জানার সুযোগ যেন একেবারেই পরাহত। জানা যায়, একবার অতিষ্ট হয়ে কোনো এক অফিসের অধঃস্তন বড় কর্মকর্তাকে বিনয়ের সাথে বলেছিল, হুজুর, পরিবহনের জটিলতা ও ট্রাফিক জ্যামের কারণে আমার অফিসে আসতে ১০ মিনিট দেরী হয়েছে। এ কারণে আপনি আমাকে তলব করেছেন। ভালো কথা। কিন্তু আপনি যে কোনোদিনই নির্ধারিত

সময়ে অফিসে আসেননি এবং বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন, তা জানারও আমার মতো অনেকেরই অধিকার রয়েছে। এ কথা শুনার পর তিনি (বড় সাহেব) তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। পরবর্তী সময় বড় কর্মকর্তার নির্বাহী আদেশে জনস্বার্থে তাকে অন্যত্র বদলী করা হয়। যদিও এসবের কোনো জবাবদিহীতা নেই। যাকে বলা যায়, এমন আদেশের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। এমনিভাবে অনয় বিনয় করে বড় কর্তার ভুল ধরতে গিয়ে কত অধঃস্তন যে বড় কর্তার রোষানলে পড়ে নাজেহাল হচ্ছে, নিপতিত হচ্ছে ও পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছে এমন নিগৃহিত, যাতনা ও উদাহরণের যেন শেষ নেই। আরও জানা যায়, একবার অফিসের কোনো এক আদেশে বড় কর্মকর্তা ইংরেজী বাক্যে ভুল লেখেন। তা সংশোধনের বিষয়ে অধঃস্তন কর্মকর্তা বড় সাহেবকে জানালে তাকে নাকি এ কারণে বড় সাহেব চরমভাবে শাসিয়ে থাকে। এসব সহ্য করতে না পেরে অধঃস্তন কর্মকর্তা ক্ষোভ, দুঃখ ও মনের ব্যথায় স্বপ্রনোদিত হয়ে ছুটি নিয়ে চলে যায়। ছুটিতে চলে যাওয়ার সময় বড় হুজুরের উক্ত ভুল বাক্যের আদেশের স্থানে অন্য একটি কাগজ সংযুক্ত করে আটা দিয়ে রেখে যায়। তাতে লাল কালি দিয়ে লেখে থাকে “হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ”। পরবর্তী সময় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে দৃষ্টি আসলে দেখা যায়, ওই কর্মকর্তার একাডেমিক সনদ যেমনি জাল তেমনি চাকরি হওয়াটাও নাকি মামা ভাগ্নের সহযোগিতা, তদবীর ও ডিও লেটারের ফসল।

আজকাল সরকারি অফিসে নাইটগার্ড, চাপরাশি, অফিস সহায়ক থেকে নিয়ে অফিস সহকারীর চাকির পাওয়া যেন সোনার হরিণ। তদোপরি উর্ধ্বতন পদে চাকরি পাওয়া তো যাতনা ও বিষাদের শেষই নেই। কিন্তু যে কোন সরকারি দফতরে চাকরির বিজ্ঞপ্তি হলে, চাকরি প্রার্থীরা যথাযথ যোগ্যতানুসারে আবেদন করে থাকে। কিন্তু অনেক সময় ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, চাকরি নিয়োগে এসব বিজ্ঞপ্তি নাকি গতানুগতিক ও লোক দেখানো ঢং ও বাহানা মাত্র। অনেক সময় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই এসব পদে লোক নিয়োগ হয়ে যায়। আর উচ্চ পর্যায় থেকে ভিভিআইপি, ভিআইপিদের তদবীর, সুপারিশ, ডিও লেটার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট তালিকা পাঠানোর কথাও শুনা যায়। এ নিবন্ধে শিরোনাম নিয়ে বলার আগে ০২/১১/১৯ ইং দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত বিশিষ্ট নিবন্ধকের কলামের আলোকে দৃষ্টিপাত করা হলো। তিনি লিখেছেন, আজ রাজধানী শহরে যে স¤্রাটকে ধরা হয়েছে শুধু সে কি একই স¤্রাট নাকি দেশের ৬৪টি জেলায়ই খোঁজ করলে এমন শত শত স¤্রাট পাওয়া যাবে। একটি জেলা শহরে সরকারি উন্নয়ন কর্মকান্ডের যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, একশ ভাগ ক্ষেত্রেই যে সেসব অর্থ একেকজন স¤্রাটের মাধ্যমে ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ ওইসব জেলা শহর, থানা শহর ইত্যাদি এলাকায় যেসব স¤্রাট (গডফাদার) রয়েছে তাদের নির্দেশে তাদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় একথাও তো সর্বজন বিদিত। আর সেসব ক্ষেত্রে কাজের কাজ যে কী হয় তাওতো সবারই জানা। এমনও দেখা গেছে একশ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডে মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ কোটি টাকা ব্যয় করে বাকি সবটাই ভাগ বাটুয়ারা করে নেয়া হয়। কিশোরগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত স্বপ্নীল নরসুন্দার উন্নয়নে পর্যায়ক্রমে নাকি ১০০ কোটি টাকার উপরে বরাদ্দ হয়েছে। এ প্রজেক্টের উন্নয়নে আদ্যোপান্ত ও হাল হকিকত দেখে উক্ত নিবন্ধকের উপরিউক্ত বক্তব্য দেখে কেহ স্বপ্নীল নরসুন্দার সমাহার ঘটালে অত্যুক্তি হওয়ার মতো তেমন কিছু না থাকারই কথা। নিবন্ধক তার কলামে আক্ষেপ করে বলেছেন, গোড়া রেখে শুধু আগা ছেঁটে কোনো লাভ হবে না। আগে ডাল ছেঁটে গোড়ায়ও হাত দিতে হবে। যাক, এ নিবন্ধের শিরোনাম নিয়ে কিছু উপস্থাপন করা হলো। প্রতিদিন লিচু গাছের মালিক সকালে গিয়ে দেখে আগের দিন গাছে যে লিচু দেখে আসে, পরের দিন তা দৃশ্যপটে আসে না। তাই একদিন যাচাই বাছাই করার জন্য রাতের বেলায় গিয়ে দেখে কে বা কাহারা লিচু গাছে বসে দেদারছে লিচু খাচ্ছে। তা দেখে সে বলতে থাকে, এত রাতে লিচু গাছে কেরে। তখন উত্তর আসে, হুজুর আমি লিচু গাছের পাহারাদার মধু। তাতে লিচু গাছের মালিক বুঝতে পারে, এতসব কিছুর জন্য দায়ী পাহারাদার। কোনো চোর বা বাদুর গাছের লিচু নষ্ট করছে না। পাহারাদার মধুই প্রতিদিন লিচু খাচ্ছে এবং বাদুরকে দোষারোপ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে পরের দিন পাহারাদারকে জিজ্ঞাসা করলে সব গোমর ফাঁক হয়ে যায়। এরপর থেকে গাছের লিচুর আর কমতি হয়নি। এসব দেখে মালিক বুঝতে পারে এসবই পাহারাদার মধুর কারসাজি। যদিও পাহারাদার প্রতিদিন এসব থেকে নিজের দোষ এড়িয়ে গিয়ে লিচু খাওয়ার জন্য বাদুরকেই দোষারোপ দিয়ে আসছিল। যদি পাহারাদারের জবাদিহীতা ও শাস্তির ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে কোনো অবস্থাতেই পাহারাদার মধু এমনিভাবে আরামছে গাছে বসে দিনের পর দিন লিচু খেতে পারত না। গোড়াতেই মালিকের ভুল থাকাতে পাহারাদার মধু এই সুযোগে এ অন্যায় কাজটি করতে পেরেছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে প্রশংসনীয় শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন, এ ব্যাপারে পাহারাদারদের ওপরও পাহারা বসানোর কথা অভিজ্ঞজনরা মনে করে থাকে। তা না হলে লিচু গাছের পাহারাদার মধু প্রতিদিন যেভাবে

বাদুরের ওপর দোষ দিয়ে লিচু খেয়ে যাচ্ছিল এমনিভাবে শুদ্ধি অভিযানের কোনো পাহারাদার লিচু খেয়ে গেলেও হয়তো কিছু করার সুযোগ না থাকারই কথা। জনৈক কলামিস্টের উক্তি ও এ নিবন্ধের শিরোনামের মর্মানুযায়ী বলা যায়, গাছের গোড়া রেখে আগা ছেঁটে যেমন লাভ হবে না তেমনি লিচু গাছে নজর না রেখে শুধু পাহারাদার বসিয়েও কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।

এ প্রসঙ্গে একটি গল্প না বললেই নয়। একবার শিয়ালকে পাহারাদার বানিয়ে ৭টি মুরগী হেফাজতে রাখা হয়। শিয়াল প্রতিদিনই একটি করে মুরগী খেয়ে শুধু ১টি মুরগী রেখেছে। যখনই হিসেবে চাওয়া হয়, তখনই ধূর্ত শেয়াল ১টি মুরগীকে ৭ বার এনে প্রদর্শন করে। তাতে সন্দেহ হলে দেখা যায়, পাহারাদার ধূর্ত শিয়াল ১টি মুরগী রেখে ৬টি মুরগীই খেয়ে ফেলেছে। এমন ভুরি ভুরি ও অজ¯্র উদাহারণের যেন শেষ নেই। যদি এতকিছুর পরও পাহারাদারের উপর নজরদারি না রেখে পাহারাদারের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয় এবং সেই পাহারাদার যদি লিচু ও মুরগীর মতো প্রতিদিন খেয়ে বাদুরের ওপর দোষ চাপায় এবং বলে হুজুর আমি পাহারাদার মধু তবে হয়তো বলার কিছু নাও থাকতে পারে। দেশের অভিজ্ঞজনরা মনে করে থাকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে আরও গতিশীল ও প্রশংসনীয় করে তুলতে হলে কাউন্টার পাহারাদার ও নজরদারি দরকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে র‌্যাব, আইন শৃংখলা বাহিনী ও দুদকের অভিযান যাতে সতর্ক ও পাহারাদারদের নজরদারি রাখা হয় তাহাও কম তাৎপর্য বহন করে না। তাই দরকার আগেভাগেই সবকিছু যাচাই-বাছাই, নিরিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ। অর্থাৎ প্রিভেন্টিভ ইজ বেটার দেন কিউরড। তা না হলে শুদ্ধি অভিযান ব্যর্থ হলে, মেরা কেয়া কছুর অর্থাৎ আমার কি দোষ বলে অন্যের ওপর দোষ চাপালে হয়তো জওয়াব নাও থাকতে পারে। সবকিছুতে নজরদারি না থাকলে যদি পাহাড়াদার বলে, হুজুর আমি একাই গাছের লিছু খাইনি, আমার সাথে ওস্তাদও ছিল। যদি শিয়াল বলে আমি একা মুরগী খাইনি আমার সাথে দানবও ছিল। তখন এসব শুনে ওস্তাদ ও দানবের চোরের হাট বাজার বলা ছাড়া মালিকের অন্য কিছু বলার সুযোগ না থাকারই কথা। ছোট বেলায় বড় আজলদী প্রাইমারী স্কুলের ছুটি শেষে বাড়ীতে ফেরার পথে দেখলাম, দলবেধে কলাবাদুর আরামচে বসে গাছের কলা খাচ্ছে। তা দেখে ছোটখাট ঢিল মেরে কলা খাওয়া থেকে বাদুরকে সরানোর চেষ্টা করা হয়। দেখা যায়, ঢিল খেয়ে বাদুর পরক্ষণেই আবার কলা খেতে থাকে। তা দেখে পরবর্তী সময় রাস্তা থেকে পাথর ও ইটের টুকরা দিয়ে ঢিল ছুঁড়াতে কলা বাদুর পরক্ষণেই চলে যায় এবং আর আসে না। আজ সারাদেশে যেভাবে ঘুষ দুর্নীতির ব্যাপ্তি ঘটেছে, একে সহজে সরানো খুবই মুশকিল বলে অভিজ্ঞজনরা মনে করে থাকে। দরকার কলাবাদুরের মতো পাথর নিক্ষেপ করে বা প্রয়োজন বোধে বোলডোজার দিয়ে ওদের তাড়ানো ও শাস্তির পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ওদের ঘাঁটি যেমন শক্ত তেমনি পাহারাদার ও ওস্তাদরাও মজবুত। তা না হলে গাছে বসে লিচু খেয়েও কিভাবে গাছের পাহারাদার মালিককে বলে, হুজুর আমি পাহারাদার মধু আর পাহারায় থেকে শিয়াল মুরগী খেয়ে দানব তা খেয়েছে বলে ভন্ডামী করে থাকে। তাই প্রথিতযশা নিবন্ধকের কথায় পরিশেষে আমিও বলব, গোড়া রেখে শুধু আগা ছেঁটে কোনো লাভ হবে না। আগে ডাল ছেঁটে গোড়ায়ও হাত দিতে হবে। তা না হলে মধুর মতো অনেকেই গাছে বসে লিচু খাবে আর বলবে হুজুর আমি পাহারাদার মধু। আর শিয়াল মুরগী খেয়ে বলবে আমি মুরগী খাইনি দানবে খেয়েছে।