প্রকৃতপক্ষেই আমাদের ব্যক্তিত্ব ও জীবনধারা বিভাজিত: মো: সোহেল মিয়া

33

মো: সোহেল মিয়া:

প্রকৃতপক্ষেই আমাদের ব্যক্তিত্ব ও জীবনধারা বিভাজিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের জীবনধারা অনেক পাল্টিয়েছে। জীবনের সফলতা ও সার্থকতার ওপর যেসব নতুন মতবাদ জনপ্রিয় হয়েছে তা পুরোনো অনেক ধ্যান ধারণার পরিপন্থী। পশ্চিমা বিশ্বে এখন জীবনে সাফল্যের জন্য নিজেকে চেনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আমরা যেমন আমাদের অভিভাবকের ও সমাজের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনের লক্ষ্য ও পেশা ঠিক করেছিলাম, এখন তেমন হয় না। আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে শেখানো হয়, তুমি নিজেকে চেনো, তুমি কী করতে চাও, কী অর্জন করতে চাও, তা ঠিক করো। তুমি কী পার তার ওপর লোকে তোমাকে দিয়ে কী করতে চায় তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার ছেলেমেয়েরা স্কুলে যা শিখে আসে, তা আমি নিজেও গভীরভাবে ভেবে দেখেছি। আমরা দ্বৈত জীবনযাপন করি। একটি হলো যেটি নিজে যাপন করতে চাই আর আরেকটি যা বাস্তবে যাপন করি।

আমি নিজেও জীবনের বেশির ভাগ সময় নিজের মতো করে যাপন করিনি। অনেকের মতো আমার ভুল ধারণা ছিল, আমি যেভাবে চাই, তেমনভাবে হয়তো চলা যায় না, অন্যদের মানিয়ে নিয়েই চলতে হয়, এটাই সমাজের নিয়ম। দেরিতে হলেও আমার উপলব্ধি হয়েছে, আমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব আমাকেই নিতে হবে। আমাকে আমার অনুভব ও অনুভূতিগুলো আমার মতো করেই লালন করতে হবে। আমি আমার মতো, অন্যেরা অন্যদের মতো। আমি কীভাবে আমার আমিকে লালন করব, তা হবে সম্পূর্ণ আমার সিদ্ধান্ত।

আমি চিরদিন আমার আমিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে ভয় পেতাম। ভাবতাম আমাকে অন্যদের খুশি করে সামাজিক জীব হিসেবে বাঁচতে হবে। সব সময় সমাজের রীতিনীতি মেনে চলতে হবে। আমার মনে হতো আমি আমার মতো থাকলে আমাকে কেউ চাইবে না। গ্রহণযোগ্যতার জন্য আমাকে অন্যদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। শুধু আমার একার নয়, অনেকেই যেভাবে বাঁচেন, সেভাবে বাঁচতে চান না। এই অনিচ্ছাকৃত বাঁচার প্রচেষ্টায় মানুষ পাওয়ার চেয়ে হারায় বেশি। আপনাকে নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করতে হবে—আপনি কী চান? কীভাবে বাঁচতে চান? কীভাবে সুখী হন? আপনি কোথায় যেতে চান? কীভাবে যেতে চান?

অন্যেরা কীভাবে কী করতে চায়, তা আপনার বিবেচ্য বিষয় নয়। আপনি অনন্য। আপনি শুধু আপনার মতো, সে শুধু তার মতো, আমি আমার মতো। আপনি যেমন সেভাবে আপনি গর্বিত হওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। আমি নিজেও আমার আমিত্ব নিয়ে গর্বিত। আমি আমার মতো থাকব, আপনি আপনার মতো। কেউ কারও সঙ্গে মানিয়ে নেবে না, মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পৃথিবীতে অনেক পেশা, অনেক ব্যক্তিত্ব ও অনেক চরিত্রের মানুষ রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা বৈচিত্র্যপূর্ণ। লাল-বেগুনির মতো নয়, নীল-হলুদের মতো নয়, সব সব রং মিলেই রংধনু হয়।

নিজের জীবন নিজের নকশায় সাজাতে হয়। জীবনটা নিজের ঘরের মতো, তাতে নিজের পছন্দের জিনিসগুলো জায়গা পায়। যে ফুল পছন্দের সেই ফুল ফুলদানিতে থাকবে। যে পোশাক পছন্দ সেগুলো আলনায় থাকবে। যে মানুষ পছন্দ সেই জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী হবে। জীবনটা একই রকম নিজের পছন্দ ও মূল্যবোধ অনুযায়ী চলবে। তবে নিজের মূল্যবোধ মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। মানুষ বিভিন্নভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। কেউ জোরে হাসে, কেউ নাচে। মানুষ দুঃখ প্রকাশ করে বিভিন্ন ভাবে। কেউ জোরে কাঁদে, কেউ নীরব গম্ভীর হয়ে যায়। যার যেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ আসে, সেটাই থাকবে। এটা অহেতুক ভয় যে, অন্যেরা আমার আবেগ প্রকাশ করার ধরন দেখে নাখোশ হবে। আসলে কিন্তু উল্টো হয়। সিনেমার বিভিন্ন চরিত্র দেখে মানুষ উল্লসিত হয়। সবাই একই রকম হলে একঘেয়ে লাগে।