রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতা জিন্নাতুনের সংগ্রামী জীবনের গল্প

32

এ কে এম শামছুল হক সুন্দরগঞ্জ(গাইবান্ধা)প্রতিনিধি: শিকার হয়েছিলেন বাল্যবিয়ের। তবুও প্রত্যয় আর ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উঠে এসেছেন সমাজের একেবারেই মুল ধারায়। সামনে থেকে নেতৃত্বে দিয়েছেন বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের। পড়ালেখার পাশাপাশি বেসরকারী চাকুরি থেকে জুটিয়ে নিয়েছেন সরকারী চাকরি। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন অবিরত। নিজের কর্ম ও নেতৃত্বকে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে তাঁর সাফল্যের সুর্যশিখা। কর্মের পুরস্কার হিসেবে এবার তিনি হয়েছেন সরকারের জয়িতা অন্বেষণের রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতা। তিনি হলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চাচিয়া নওহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিন্নাতুন ফেরদৌসী। শিক্ষা ও চাকরীর ক্ষেত্রে সফলতার স্বীকৃতি স্বরুপ বুধবার রংপুরে তাঁকে এই শ্রেষ্ঠত্বের সম্মামনা তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুননেছা ইন্দিরা।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৃনুমলের সংগ্রামী ও সফল নারীদের আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষে জয়িতা অন্বেষণ বাংলাদেশ কর্মসূচির আওতায় এই শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়। রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কেএম তরিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মামনা প্রদান অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার, মহলিা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহা পরিচালক বদরুর নেছা, রংপুরের উপ পরিচালক কাওসার পারভীন প্রমুখ।

আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবারের রংপুর বিভাগের মধ্যে প্রথম জয়িতা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের চাচিয়া নওহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিন্নাতুন ফেরদৌসী একজন আলোকিত নারী। ১৯৬৬ সালে নওগার আত্রাইয়ের সাহেবগঞ্জ গ্রামের জন্ম গ্রহন করেন তিনি। জন্মের ৫ বছরের মাথায় পিতা হারা হয়েছিলেন তিনি। ভাইয়ের সংসার থেকে শুরু হয় পড়ালেখার হাতেখরি। স্থানীয় সাহেবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রাজশাহীর ভবানীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাটিকেুলেশন পাশ করেন তিনি। ফলাফল বের হওয়ার আগেই বিয়ে হয় সুন্দরগঞ্জে। সেখানে তার ভাই আবু সায়েম বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত ছিলেন তখন। ভাইয়ের পছন্দেই বিয়ে হয়। শশুড় বাড়িতে গিয়ে বাঁধা আসে লেখাপড়ায়।

তবুও পিছে থাকেন নি তিনি। ভর্তি হন সুন্দরগঞ্জ ডি ডব্লিউ ডিগ্রী কলেজে। সেখান থেকে পাশ করেন ইন্টারমিডিয়েট। তখনই কোল জুড়ে আসে কন্যা সন্তান। শুরু হয় স্বামী ও শ^াশুড়ীর নানামুখি নির্যাতন। এরই মধ্যে পড়া লেখা চালিয়ে যেতে থাকেন। চাকরি নেন বিভিন্ন বেসরকরারি সংস্থায়। চেস্টা করতে থাকেন সরকারী চাকরির। চলতে থাকে পড়ালেখাও। ১৯৯০ সালে গাইবান্ধা সরকারী কলেজ থেকে পাশ করেন বিএ। এরই মধ্যে ১৯৯৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকুরিতে যোগ দেন। এরপর আর থেমে থাকেন নি তিনি। চাকরির পাশাপাশি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে থাকেন। রংপুর টিসার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে পাশ করেন বিএএড ও রংপুর ল কলেজ থেকে এলএলবি।

শিক্ষকতার পাশাপাশি শুরু করেন পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম। নিজে বাল্যবিয়ে শিকার হলেও সামনে থেকে রোধ করেছেন সমাজের বাল্যবিবাহ। আন্দোলন গড়ে তুলেছেন পাড়ায় পাড়ায়। নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের চেস্টা করেছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে অংশগ্রহন করেছেন। সাথে চালিয়ে গেছেন স্কাউটিং। স্কাউটিংয়ে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পাশাপাশি তিনি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত সফর করেন কৃতিত্বের সাথে। এরই মধ্যে ২০০৬ সালে ভেঙ্গে যায় সংসার। তবুও হাল ছাড়েন নি তিনি। ২০০৯ সালে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হন। কৃতিত্বের পুরস্কার নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে। এবারের জয়িতা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় রংপুর বিভাগের ৪০ জন নারী অংশ নেন। এরমধ্যে শিক্ষা ও চাকরী ক্ষেত্রে অংশ নেন ১০ জন। এরমধ্যে প্রথম নির্বাচিত হন জিন্নাতুন ফেরদৌসী।

সংগ্রামী এই নারী জানালেন, নারীদের স্বাবলম্বী হয়েই সংসার জীবনে যাওয়া উচিৎ। তাতে সমস্যা কম হবে। অর্থনৈতিকভাবে সংসার এগিয়ে যাবে। সমাজ এগিয়ে যাবে। এগিয় যাবে দেশ।